কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে হৃদয়বিদারক এক ঘটনায় মা ও তার ১৬ মাস বয়সী শিশুকন্যার মৃত্যু ঘিরে রহস্য দেখা দিয়েছে। এটি আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যা—এ নিয়ে এলাকায় চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। পুলিশ বলছে, ঘটনাটি প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা মনে হলেও তদন্তের পর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল বুধবার সকাল ১০টার দিকে, ফটিকছড়ি উপজেলা সদর বিবিরহাট এলাকার পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পেছনে কামাল ভবনের নিচতলায়। নিহতরা হলেন ওই এলাকার মো. কামালের ছেলে মো. আনোয়ার হোসেন বিবলোর স্ত্রী আফরিন আক্তার আফরোজা (২৫) এবং তার ১৬ মাস বয়সী শিশু কন্যা আতকিয়া আয়েশা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সকালে আফরিন তার শিশুকন্যাকে নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। দীর্ঘ সময় পার হলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে পরিবারের লোকজন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তারা বারবার দরজায় কড়া নাড়লেও কোনো সাড়া না পেয়ে অবশেষে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন। পরে ফটিকছড়ি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দরজা ভেঙে মা–মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করে।
ঘরের ভেতরে দৃশ্য ছিল মর্মান্তিক—গৃহবধূ আফরিনের দেহ ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায়, আর খাটের উপর নিথর পড়ে ছিল তার শিশু কন্যা আয়েশা।
নিহতের শ্বশুর মো. কামাল বলেন,
“প্রায় আড়াই বছর আগে আমার ছেলে আনোয়ারের সঙ্গে আফরিনের বিয়ে হয়। তাদের একমাত্র সন্তান আয়েশা। কিছুদিন ধরে আমার পুত্রবধূ মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। আমরা তাকে ডাক্তার ও কবিরাজের কাছে চিকিৎসা করাচ্ছিলাম। হয়তো মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় নিজের মেয়েকে হত্যা করে পরে আত্মহত্যা করেছে।”
নিহতের ননদ তাসলিমা আক্তার জানান,
“বিয়ের পর থেকেই ভাবি ঘরে ভয় পেতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন—ঘরে জ্বীন আসে, ভয় লাগে। কয়েক দিন ধরে এই ভয় ও মানসিক অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। ভাবি সারাদিন দরজা বন্ধ করে একা থাকতেন।”
তবে স্থানীয়রা বলছেন, ঘটনার পেছনে পারিবারিক কলহ, মানসিক চাপ কিংবা অন্য কোনো রহস্যও থাকতে পারে। তারা দাবি করছেন, বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
ফটিকছড়ি থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম বলেন,
“খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা ভেঙে মা ও মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করেছি। ঘরের দরজাটি ভেতর থেকে আটকানো ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে—গৃহবধূ আফরিন তার কন্যা শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যার পর নিজে ফ্যানের সাথে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন,
“তদন্তের পর স্পষ্ট হবে এটি আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু। সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
মা ও শিশুর এমন করুণ মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্থানীয়দের মতে, আফরিন ছিলেন শান্ত ও হাসিখুশি স্বভাবের। তার এমন পদক্ষেপ সবাইকে হতবাক করেছে। প্রতিবেশীরা বলছেন, মানসিক অসুস্থতা থাকলেও তার প্রতি পরিবার ও সমাজের আরও যত্নশীল হওয়া দরকার ছিল।
সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো না গেলে এ ধরনের পারিবারিক ট্র্যাজেডি ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।
নিহতের পরিবার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। পুলিশের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, তদন্ত শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।