মহেশখালীতে প্রধান শিক্ষকের জন্মসাল জালিয়াতি: তদন্তে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

মহেশখালীতে ঘটে গেছে শিক্ষা প্রশাসনকে নড়ে-চড়ে বসানোর মতো এক অভূতপূর্ব ঘটনা। একজন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিজের অবসরের সময় পিছিয়ে দিতে জন্মসাল জালিয়াতি করেছেন—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে। বিষয়টি বর্তমানে এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। শিক্ষা ব্যবস্থা, নৈতিকতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, হোয়ানক বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবু তাহেরের প্রকৃত জন্মসাল ০১/০১/১৯৬৬ ইং, যা তাঁর জন্মসনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং এসএসসি সনদে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ রয়েছে। সেই হিসেবে তাঁর অবসরে যাওয়ার তারিখ হওয়া উচিত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫। কিন্তু অকল্পনীয় হলেও সত্য—সব সনদে একই জন্মতারিখ থাকা সত্ত্বেও তিনি গোপনে নিজের বয়স এক বছর কম দেখিয়ে জন্মসাল ০১/০১/১৯৬৭ করে নেন।

সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে—এ সংশোধন করতে গিয়ে তিনি নিজেই নিজেকে “অষ্টম শ্রেণি পাস” প্রত্যয়নপত্র দিয়ে এমনভাবে নতুন করে নথিপত্র তৈরি করেন, যা স্থানীয়দের মতে “বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নজিরবিহীন এক কাণ্ড”।

চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা পদ্ধতি

২০২০ সালে তিনি নিজের স্বাক্ষরেই তৈরি করেন একটি নতুন প্রত্যয়নপত্র, যেখানে উল্লেখ করা হয়—তিনি অষ্টম শ্রেণি পাস। অথচ বাস্তবে তিনি বি.এ., বি.এড ডিগ্রিধারী। এই মিথ্যা প্রত্যয়নপত্রকে ভিত্তি করে তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জন্মনিবন্ধন সংশোধন করে নেন। জন্মতারিখ ০১/০১/১৯৬৬-এর স্থলে যুক্ত হয় ০১/০১/১৯৬৭ ইং

অথচ বিদ্যালয়ের এমপিও কপিতে ২০২৪ সাল পর্যন্তও তাঁর জন্মতারিখ ছিল ০১/০১/১৯৬৬ ইং।

“লুটপাট সিন্ডিকেট”—অভিযোগ স্থানীয় জনপ্রতিনিধির

স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি জানান—

“ওই বিদ্যালয়ে লুটপাট সিন্ডিকেট আছে। মিলেমিশে প্রধান শিক্ষক আরও এক বছর চাকরিতে থাকতে চাইলে জন্মসাল পরিবর্তন করে নেয়। উনি নিজেই নিজেকে অষ্টম শ্রেণি পাশ দেখিয়ে এমন জালিয়াতি করেছেন, যা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

তাঁর মতে, প্রধান শিক্ষকের বয়স বাড়িয়ে বা কমিয়ে চাকরির মেয়াদ বাড়ানো মানেই বিদ্যালয়ের আর্থিক লেনদেনে আরও এক বছর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা।

সহকারী প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ

ঘটনার গভীরে যেতে গিয়ে দেখা যায়—হোয়ানক বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা ১৮ নভেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি আলোচনায় আসে।

একই সঙ্গে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা নির্বাচন অফিস ও শিক্ষা অফিসে শুরু হয় প্রশাসনিক তদারকি।

ইউপি সদস্যের অভিযোগ: ‘আমার স্বাক্ষরও জাল’

হোয়ানক ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নং ওয়ার্ড সদস্য আশেক ইলাহী জানান—

“প্রধান শিক্ষক আবু তাহের তাঁর জন্মসনদে আমার স্বাক্ষর পর্যন্ত জাল করেছেন। একজন শিক্ষিত মানুষ কীভাবে নিজের জন্মসাল বদলাতে গিয়ে এমন প্রতারণা করতে পারে, তা সত্যিই হতাশার।”

তিনি আরও জানান, ইউনিয়ন পরিষদের বৈঠকে সেই জন্মসনদটি বাতিল করে ইউএনও-এর কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ইউপি সচিবের স্বীকারোক্তি ও দ্বিধা

ইউপি সচিব আনন্দ বড়ুয়া বলেন—

“শিক্ষিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জন্মসাল যাচাইয়ের সময় এসএসসি সনদই মূল ভিত্তি। একজন শিক্ষক নিজের জন্মসনদ নিজেই প্রত্যয়ন দিয়ে সংশোধন করলেন—এটা নিয়মবহির্ভূত।”

তবে কীভাবে এটি সম্পন্ন হলো জানতে চাইলে তিনি জানান, কম্পিউটার ব্যবস্থাপনায় দক্ষ না থাকায় সব যাচাই করতে পারেননি।

এনআইডি সংশোধনে প্রশ্ন

সাবেক উপজেলা নির্বাচন অফিসার বিমলেন্দু কিশোর পাল বলেন—

“আবু তাহের অষ্টম শ্রেণির প্রত্যয়নপত্র, সংশোধিত জন্মসনদ ও এফিডেভিট জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে এসএসসি সনদের জন্মতারিখই ব্যবহার করতে হতো।”

প্রতিষ্ঠানের প্রধান হয়ে তথ্য গোপন করে এনআইডি সংশোধন করায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

শিক্ষক সমাজের উদ্বেগ

অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন শিক্ষক বলেন—

“প্রধান শিক্ষক যদি এমন কাজ করেন, তবে শিক্ষার্থীরা নৈতিকতা শিখবে কীভাবে? এ ধরনের জালিয়াতি করে পার পেয়ে গেলে ভবিষ্যতে অনেকেই একই পথে হাঁটবে।”

প্রধান শিক্ষকের নীরবতা

বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবু তাহেরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গাড়িতে আছেন বলে পরে কথা বলার কথা জানান। পরবর্তীতে আর যোগাযোগ পাওয়া যায়নি।

শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ জাহিদুর রহমান জানান—

“তিনি জন্মসাল সংশোধনের ভুল কৌশল নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। সঠিক জন্মতারিখ অনুযায়ী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে তাঁর অবসর নিশ্চিত করা হবে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্য

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ হেদায়েত উল্ল্যাহ বলেন—

“ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। লিখিত অভিযোগের পর উপজেলা নির্বাচন অফিসারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের অবস্থান

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক ড. খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল স্পষ্ট করে বলেন—

“জন্মনিবন্ধন, এনআইডি ও এসএসসি সনদে একই জন্মসাল থাকা সত্ত্বেও সেটি পরিবর্তন করার কোনও সুযোগ নেই। কেউ পরিবর্তন করলে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সচেতন মহলের ক্ষোভ

একজন প্রধান শিক্ষকের এ ধরনের কর্মকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকরা। তাঁদের মন্তব্য—

“যিনি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়ার কথা, তিনিই যদি নিজের স্বার্থে নথিপত্র জাল করেন, তাহলে এটি পুরো সমাজের জন্য ভয়াবহ সংকেত।”

তারা আশা করেন—এ ঘটনায় প্রশাসন দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনও শিক্ষক বা কর্মকর্তা এমন জালিয়াতির সাহস না পান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *