দুর্নীতির কালো ছায়া: খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বদলি বাণিজ্য

স্টাফ রিপোর্টার:

খুলনা শহরের বয়রা এলাকায় খাদ্য অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয়টি দেখতে অনেকটা সাধারণ সরকারি ভবনের মতো। বাইরে থেকে শান্ত, নিরিবিলি। কিন্তু ভেতরের গল্পটা একেবারে অন্যরকম। এখানে চলে এক অদৃশ্য বাণিজ্য—বদলির বাণিজ্য। যেখানে লাখ লাখ টাকা হাতবদল হয় শুধু একটা সইয়ের বিনিময়ে। এই বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ।

তিনি যোগদানের পর থেকে খুলনা বিভাগের খাদ্য বিভাগে একের পর এক বদলির আদেশ আসতে থাকে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, খাদ্য পরিদর্শক—সবাইকে নতুন পোস্টিং। কিন্তু এই বদলিগুলো কি সত্যিই প্রশাসনিক প্রয়োজনে? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অর্থের লেনদেন?

আমাদের অনুসন্ধান শুরু হয় এক অজ্ঞাত সূত্র থেকে। একজন খাদ্য পরিদর্শক, যিনি নিজেও এই বদলির শিকার হয়েছেন, গোপনে ফোন করেন।
তিনি বলেন, “স্যার, এখানে যা চলছে তা বললে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। খুলনায় থাকতে চাইলে লাখ টাকা দিতে হয়। অন্য জেলায় যেতে চাইলে আরও বেশি। আর যদি ভালো পোস্টিং চান, তাহলে তো কথাই নেই।”

তার কথা শুনে আমি খুলনায় অফিসে যাই ছদ্মবেশে। অফিসের সামনে একটি ছোট চায়ের দোকানে বসে কথা বলি খাদ্য বিভাগের কয়েকজন নিম্নস্তরের কর্মচারীর সঙ্গে। তারা জানান, “মামুন সাহেবের অফিসে যাওয়ার আগে দালালদের সঙ্গে কথা বলতে হয়। দালালরা রেট ফিক্স করে। খুলনা শহরে থাকার জন্য ৫–১০ লাখ, যশোর বা সাতক্ষীরায় যাওয়ার জন্য ৩–৫ লাখ। টাকা না দিলে বদলি হয় দুর্গম এলাকায়।”

একজন দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করলে নাম না জানা এক অফিস কর্মকর্তা বলেন, “ভাই, এটা তো সবাই জানে। আরসি সাহেব (আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক) ছাড়া কোনো বদলি হয় না। আমরা শুধু মাঝখানে থাকি। টাকা সরাসরি তার পিএসের হাতে যায়। গত বছর এক উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক খুলনায় আসার জন্য ৮ লাখ টাকা দিয়েছে। এখন সে ভালোই আছে।”

অনুসন্ধান আরও গভীর করি। খাদ্য অধিদপ্তরের কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, “এই বদলি বাণিজ্য নতুন না। কিন্তু মামুনুর রশীদের সময়ে এটা রেকর্ড ছাড়িয়েছে। গত দুই বছরে অন্তত ৫০টি বদলি হয়েছে। প্রতিটির পেছনে গড়ে ৫ লাখ টাকা। হিসাব করেন, কত কোটি টাকা!”

কিন্তু কীভাবে এই টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়?

সূত্র জানায়, টাকা ক্যাশে নেওয়া হয়। কখনো ব্যাংক ট্রান্সফার, কখনো হুন্ডি। মামুনুর রশীদের এক আত্মীয়ের নামে খুলনায় একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি আছে। সেখান দিয়ে অনেক টাকা সাদা করা হয়। তার বাড়ি খুলনা শহরের অভিজাত এলাকায়। গাড়ি, ফ্ল্যাট—সবই নতুন। বেতনের সঙ্গে এসবের কোনো মিল নেই।

একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যশোরের এক খাদ্য নিয়ন্ত্রক খুলনায় বদলি চান। তার স্ত্রী অসুস্থ, শহরে চিকিৎসা প্রয়োজন। দালালের মাধ্যমে ৭ লাখ টাকা দেন। কিন্তু বদলি হয় না। পরে জানা যায়, আরেকজন ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন। আহমেদ হোসেন এখনো দুর্গম এলাকায় পোস্টেড। তার অভিযোগ, “এটা তো ডাকাতি। আমরা চাকরি করি জনগণের জন্য, কিন্তু এখানে চলে টাকার রাজত্ব।”

খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের এক পরিদর্শক টাকা দিতে না পারায় বদলি হয়ে যান মেহেরপুরে। সেখানে গিয়ে তিনি খাদ্য গুদামে অনিয়ম দেখতে পান। রিপোর্ট করতে গেলে উল্টো তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ আনা হয়। শেষে তাকে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হয়। সূত্র জানায়, এটি মামুনুর রশীদের নির্দেশেই করা হয়েছে। কারণ যিনি রিপোর্ট করেছিলেন, তিনি টাকা দেননি।

এই বদলি বাণিজ্য শুধু কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। খাদ্য ব্যবসায়ীরাও এতে জড়িত। যারা ওএমএস ডিলারশিপ পান, তারাও ভালো এলাকায় ডিলারশিপের জন্য টাকা দেন। ফলে দরিদ্র মানুষের খাদ্য সহায়তা সঠিকভাবে পৌঁছায় না। চাল-গম চুরি হয়, বিক্রি হয় কালোবাজারে। আর এর পেছনে মূল চালিকা শক্তি এই বদলি বাণিজ্য।

আমি চেষ্টা করি মামুনুর রশীদের সঙ্গে কথা বলার। তার অফিসে গেলে পিএ বলেন, “স্যার ব্যস্ত। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগবে।” ফোন করলেও তিনি ধরেন না। কোনো জবাব আসে না।

দুদকের এক সূত্র জানায়, “খাদ্য অধিদপ্তরের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আমরাও পেয়েছি। কিন্তু প্রমাণের অভাবে মামলা করা যাচ্ছে না। সাক্ষী দিতে কেউ রাজি হয় না। সবাই ভয় পায়।”

এই দুর্নীতির ফলে খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। দরিদ্র মানুষ সঠিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়। কর্মকর্তারা টাকার লোভে অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। আর রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয় একটি চক্র।

এটি শুধু খুলনার গল্প নয়। সারা দেশের খাদ্য অধিদপ্তরেই প্রায় একই চিত্র। তবে খুলনায় পরিস্থিতি চরমে পৌঁছেছে। মামুনুর রশীদের মতো কর্মকর্তারা এবং মমতাজ পারভীনসহ বিভিন্ন দালাল যতদিন এই ব্যবস্থার চালিকা শক্তি হিসেবে থাকবে, ততদিন এই বদলি বাণিজ্য চলতেই থাকবে।

প্রশ্ন হলো—কবে এর অবসান হবে? কবে সৎ কর্মকর্তারা নির্ভয়ে কাজ করতে পারবেন? কবে জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা সুরক্ষিত হবে?

এই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *