স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও রোগ নিয়ন্ত্রণে অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র

স্টাফ রিপোর্টার:

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যা, যা বিশেষ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) অধীন হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, ঔষধ ও যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে বারবার প্রকাশ পাচ্ছে। করোনা মহামারির সময় এই দুর্নীতির চিত্র সবচেয়ে নগ্নভাবে সামনে এলেও পরবর্তী বছরগুলোতেও অনিয়ম কমেনি। বরং প্রকিউরমেন্টে সিন্ডিকেট, নিম্নমানের সামগ্রী সরবরাহ, অপ্রয়োজনীয় ক্রয়, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে স্বাস্থ্যসেবার মান দিন দিন অবনতি হচ্ছে। এতে সাধারণ রোগী যেমন ভোগান্তিতে পড়ছেন, তেমনি রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ অপচয় হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনা, ঔষধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ, জনবল নিয়োগ, পাশাপাশি টিকাদান, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, মা ও শিশু স্বাস্থ্য কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব প্রকট। বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালগুলোর প্রয়োজন নিরূপণ না করেই কোটি কোটি টাকার ঔষধ ও যন্ত্রপাতি কেনা হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ গুদামে পড়ে থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে রোগীরা হাসপাতালে এসে ন্যূনতম সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

২০২০ সালের করোনা মহামারির সময় স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির ভয়াবহ রূপ প্রকাশ পায়। সে সময় এন-৯৫ মাস্ক, পিপিই, ভেন্টিলেটর ও অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। নিম্নমানের ও ভুয়া মানসনদযুক্ত পণ্য সরবরাহ করেও পূর্ণ বিল উত্তোলনের ঘটনা আলোচিত হয়। একই সঙ্গে কোভিড-১৯ পরীক্ষার নামে জাল সনদ ইস্যু করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি হেলথকেয়ারের মতো প্রতিষ্ঠানের কেলেঙ্কারি দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। এসব ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করলেও মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

করোনা পরবর্তী সময়েও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম কমেনি। বরং সরকারি হাসপাতালগুলোতে দালালচক্র আরও সংগঠিত হয়েছে বলে অভিযোগ রোগী ও স্বজনদের। বেড বরাদ্দ, অপারেশন থিয়েটার বুকিং, আইসিইউ পাওয়া, এমনকি ডাক্তার দেখানো—সব ক্ষেত্রেই দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে। এতে গরিব ও মধ্যবিত্ত রোগীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেক সময় জরুরি রোগী বেড না পেয়ে চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারালেও দায় কেউ নিচ্ছে না।

২০২৫ সালে প্রকাশিত একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে, সরকারি হাসপাতালের প্যাথলজি ও ডায়াগনস্টিক সেবায় শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়। অভিযোগ রয়েছে, কিছু চিকিৎসক অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা লিখে রোগীদের নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠান। এর বিনিময়ে তারা কমিশন পান। ফলে সরকারি হাসপাতালের নিজস্ব ল্যাব ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার না হওয়ায় সেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, অথচ রোগীদের বাইরে গিয়ে বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম ২০২৫ সালে প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে, হাসপাতালকেন্দ্রিক দুর্নীতির সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে এককভাবে সরকারের পক্ষে এটি ভাঙা কঠিন; সামাজিক ও নাগরিক উদ্যোগ ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয়।

রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতেও অনিয়মের অভিযোগ কম নয়। করোনা মোকাবিলায় ওয়ার্ল্ড ব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পিপিই, মাস্ক, থার্মোমিটারসহ বিভিন্ন সামগ্রী ক্রয়ে কোটি কোটি টাকার হিসাব গরমিলের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি অডিট প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রায় ৩৪ কোটি টাকার সরঞ্জামের সঠিক হিসাব স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দিতে পারেনি। এছাড়া জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে অপ্রয়োজনীয় ক্রয়, মেয়াদোত্তীর্ণ টিকা সংরক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার অভিযোগও রয়েছে।

ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগ নিয়ন্ত্রণে মশক নিধন কার্যক্রমেও অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়হীনতার সুযোগে নিম্নমানের কীটনাশক ক্রয়, অতিরিক্ত দামে বিল উত্তোলন এবং কার্যকর নজরদারির অভাবের কারণে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লেও দায়দায়িত্ব নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো একে অপরের দিকে আঙুল তোলে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে এই অনিয়মের মূল কারণ হলো প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়ার দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাব। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) লঙ্ঘন করে সরাসরি ক্রয়, মৌখিক নির্দেশে কাজ দেওয়া এবং একই ঠিকাদার বা সরবরাহকারীকে বারবার সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক গবেষণায় উল্লেখ করেছে, স্বাস্থ্য খাতে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটে মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও হাসপাতাল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। ফলে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ হলেও বিল পরিশোধে কোনো বাধা থাকে না।

সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের কথা বলা হলেও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অবৈধ ক্লিনিক বন্ধ, ডিজিটাল মনিটরিং জোরদার, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে নাগরিক তদারকি কমিটি গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে বাস্তবে চিকিৎসক ও নার্সের তীব্র সংকট (প্রায় ১০ হাজার চিকিৎসকের পদ শূন্য), বাজেট সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে এসব উদ্যোগ কার্যকর হচ্ছে না।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয় নয়; এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় রোগীর মৃত্যু, সংক্রামক রোগের বিস্তার এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তারা মনে করেন, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থা, কঠোর নজরদারি, স্বাধীন অডিট এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এই সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব। অন্যথায়, দেশের স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা আরও গভীর হবে এবং এর চরম মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *