মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:
খুলনা বিভাগের শিশু স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের জন্য গৃহীত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প আজ অবহেলা, অনিয়ম ও সম্ভাব্য দুর্নীতির কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। ২০১৭ সালে অনুমোদিত খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল সম্প্রসারণ প্রকল্পে সরকারি হিসাব অনুযায়ী মোট ১১৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। প্রকল্পের প্রথম ধাপ ২০২৪ সালের জুন মাসে কাগজে-কলমে সম্পন্ন ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে হাসপাতাল এখনও হস্তান্তর হয়নি। হাসপাতাল চালু হয়নি, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা হয়নি, ফলে বিশাল অবকাঠামো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সীমানাপ্রাচীর নেই, প্রধান ফটক নেই, এমনকি গরু ও ছাগলও ভবনের আশপাশে অবাধে চরছে। এই পরিস্থিতি খুলনা বিভাগের ১০টি জেলার শিশুদের উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করছে।
প্রকল্পের পটভূমি ও উদ্দেশ্য
খুলনা বিভাগে শিশু রোগীদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৭ সালে এই প্রকল্প অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল ২০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি আধুনিক শিশু হাসপাতাল নির্মাণ, যা খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর জেলার শিশুদের উন্নত চিকিৎসা প্রদান করবে।
প্রকল্পের প্রথম ধাপে ৫ তলা ভবন নির্মাণের জন্য ১১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সংশোধিত প্রস্তাবে আরও ৩৭ কোটি টাকা যোগ করা হয় দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত সম্প্রসারণের জন্য। প্রকল্পের আওতায় রান্নাঘর, সাবস্টেশন, পাম্পহাউস, গভীর নলকূপসহ অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামোও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২১ সাল পর্যন্ত, কিন্তু ধীরগতি ও নানা কারণে একাধিকবার মেয়াদ বাড়ানো হয়। অবশেষে ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। তবে হাসপাতাল ভবন হস্তান্তর না হওয়ায় সেবা শুরু হয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগ ও গণপূর্ত বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকল্প দেরির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ
প্রকল্পটি শুরু থেকেই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ঘিরে রয়েছে। ২০২২ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) খুলনায় ১০টি সরকারি প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু করে, যার মধ্যে খুলনা শিশু হাসপাতাল সম্প্রসারণ প্রকল্প অন্যতম।
প্রকল্পের ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা, বিল অতিরিক্ত দেখানো এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। হাসপাতাল ভবন সম্পন্ন হওয়ার পরও সীমানাপ্রাচীর, প্রধান ফটক, রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ অসম্পূর্ণ রাখা হয়েছে। ফলে ভবনটি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, ভবনের চারপাশে গবাদি পশু চরছে, যা নির্মাণের মান এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার উপর প্রশ্ন তোলে।
বর্তমানে নতুন করে ৯৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে ছয় থেকে দশ তলা সম্প্রসারণ, বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর জন্য। এটি প্রথম ধাপের অসম্পূর্ণতা ঢাকার চেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জনবল নিয়োগ না হওয়াও একটি বড় অনিয়ম। চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ না করায় হাসপাতাল চালু করা সম্ভব নয়। ফলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হচ্ছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এবং উদাসীনতার কারণে কোটি কোটি টাকার এই প্রকল্প ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে আছে।
স্থানীয়দের ক্ষোভ
খুলনা বিভাগের শিশুরা এখনও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা অন্যান্য সাধারণ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছে, যেখানে শিশু বিশেষজ্ঞ সুবিধা সীমিত। ফলে শিশু মৃত্যুর হার বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক ও সচেতন মহল দ্রুত হাসপাতাল চালুর দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, প্রকল্পে দুর্নীতি প্রমাণিত হলে দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তি দেওয়া হোক এবং হাসপাতাল অবিলম্বে চালু করা হোক।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
গণপূর্ত বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলেও হস্তান্তর প্রক্রিয়া এখনও চলমান। স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দুদকের পূর্ববর্তী অনুসন্ধানের ফলাফলও প্রকাশ্যে আসেনি।
উপসংহার
খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল সম্প্রসারণ প্রকল্পটি মূলত খুলনা বিভাগের শিশু স্বাস্থ্যসেবার একটি মাইলফলক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে এটি একটি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে প্রকল্পটি তদন্ত করে দায়ীদের বিচার করা এবং হাসপাতাল চালু করা। অন্যথায় জনগণের কোটি কোটি টাকা অপচয় ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার ঘটনা আরও বড় প্রশ্ন তুলবে।