এইচ এম হাকিম:
মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন আর উৎসবের আমেজ—এ যেন এক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বিশেষ করে ঈদের সময় ঘনিয়ে এলে মধ্যবিত্ত পরিবারের অন্দরমহলে যে নীরব যুদ্ধ শুরু হয়, তা বাইরের চাকচিক্য দিয়ে পরিমাপ করা অসম্ভব। মধ্যবিত্তের ঈদ মানে কেবল আনন্দ নয়, বরং সীমিত আয়ের সঙ্গে অসীম চাহিদার এক অসম লড়াই। এই লড়াইয়ের প্রতিটি ধাপে রয়েছে হিসাব মেলানোর ক্লান্তি আর সামাজিক মর্যাদা ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা। রমজানের শুরু থেকে ঈদের দিন পর্যন্ত একজন মধ্যবিত্ত গৃহকর্তার মানসিক ও আর্থিক চাপের সেই করুণ ও বাস্তব চিত্রটি কেবল একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকই উপলব্ধি করতে পারেন।
রমজান মাস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মধ্যবিত্তের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করে। ১০ই রমজানের পর থেকে পরিবারের কর্তার সে চাপ আরও বৃদ্ধি পায়। সিয়াম সাধনার এই মাসে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি যুক্ত হয় অতিরিক্ত বাজার খরচের চাপ। সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারি ও সেহরিতে একটু ভালো মানের খাবার—যেমন ফলমূল, ছোলা, ডাল, বেসন বা ভালো মানের তেলের জোগান দেওয়াটা প্রতিটি পরিবারের কর্তার লক্ষ্য থাকে। কিন্তু বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের যে লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, তাতে সাধারণ চাল-ডালের সংস্থান করতেই হিমশিম খেতে হয়। রমজানে একটু ভালো খাওয়ার এই বাড়তি আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গিয়ে মাসের নিয়মিত বাজেট মুহূর্তেই তছনছ হয়ে যায়। চিনি থেকে শুরু করে ভোজ্যতেল—সবকিছুর অগ্নিমূল্য মধ্যবিত্তের পকেটে সরাসরি আঘাত হানে। ফলে মাসের ১৫ তারিখ পার হতেই জমানো টাকায় টান পড়ে, যা শুরুতেই পরিবারের কর্তার মনে একপ্রকার অস্থিরতা তৈরি করে।
রমজানের এই বাড়তি খরচের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই সামনে এসে দাঁড়ায় ঈদের কেনাকাটার পাহাড়সম চাহিদা। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবা-মা হয়তো নিজেদের জন্য নতুন পোশাকের কথা ভাবেনই না, কিন্তু সন্তানদের রঙিন স্বপ্ন পূরণে তারা কোনো কমতি রাখতে চান না। শপিং মলগুলোতে যখন নতুন নতুন ডিজাইনের পোশাকের পসরা বসে, তখন সন্তানদের সেই আবদার মেটানো মধ্যবিত্ত বাবার জন্য এক বিশাল মানসিক চাপ হয়ে দাঁড়ায়। নিজের ছিঁড়ে যাওয়া স্যান্ডেল বা পুরোনো পাঞ্জাবিটা ইস্ত্রি করে ঈদের নামাজ পড়ার সিদ্ধান্ত তিনি মনে মনে নিয়ে নিলেও, সন্তানের জন্য সেরা পোশাকটি কেনার চেষ্টা করেন। এই কেনাকাটার বাজারে গিয়ে যখন দেখা যায় সামান্য একটি সুতি থ্রি-পিস বা পাঞ্জাবির দামও নাগালের বাইরে, তখন সেই মধ্যবিত্ত মানুষটি ভিড়ের মধ্যে নিজেকে খুব অসহায় বোধ করেন। বাজেটের সঙ্গে পছন্দের অমিল আর সামর্থ্যের সঙ্গে শখের এই দূরত্ব তাকে প্রতি মুহূর্তে হতাশায় ডুবিয়ে দেয়।
শুধু পোশাক নয়, ঈদের দিনের খাবারের আয়োজন মধ্যবিত্তের জন্য আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঈদের সকালে সেমাই-চিনি আর দুপুরে একটু ভালো মানের মাংসের আয়োজন বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্য। কিন্তু কোরবানির ঈদ না হলেও রোজার ঈদে গরুর মাংস বা মুরগির মাংসের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়। সেমাই, চিনি, দুধ এবং পোলাও চালের বাড়তি খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক সময় সঞ্চয় ভেঙে ফেলতে হয়। একজন মধ্যবিত্ত গৃহকর্তা যখন বাজারে যান, তখন তার মাথায় শুধু বর্তমানের খরচ নয়, বরং ঈদের পরের দিনগুলো কীভাবে কাটবে সেই চিন্তাটাও ঘুরপাক খায়। ভালো মানের মাংস আর মিষ্টির জোগান দিতে গিয়ে তাকে মাসের অন্যান্য অতিপ্রয়োজনীয় খরচগুলো কাটছাঁট করতে হয়। এই যে ‘এক্সট্রা’ বা অতিরিক্ত টাকার সংস্থান করা, এটিই হলো মধ্যবিত্তের আসল মাথাব্যথা। যাদের নির্দিষ্ট বেতনের বাইরে উপার্জনের অন্য কোনো পথ নেই, তাদের জন্য এই বাড়তি কয়েক হাজার টাকা জোগাড় করা যেন হিমালয় জয়ের সমান।
এই আর্থিক সংকটের সবচেয়ে করুণ দিক হলো সামাজিক মর্যাদা। মধ্যবিত্ত মানুষ না পারে নিম্নবিত্তের মতো কারো কাছে হাত পাততে, না পারে উচ্চবিত্তের মতো দুহাতে খরচ করতে। আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় ইফতার পাঠানো, ঈদে ছোটদের সালামি দেওয়া এবং মেহমানদারির খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক সময় তারা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। কারো কাছ থেকে ধার নেওয়াটা যেমন তাদের আত্মসম্মানে বাধে, তেমনি সামাজিক লৌকিকতা রক্ষা না করাটাও তাদের কাছে অসম্মানজনক মনে হয়। ফলে এই ত্রিমুখী চাপে পড়ে পরিবারের কর্তা এক তীব্র মানসিক হতাশায় ভোগেন। রাতে ঘুম আসে না, কেবল ক্যালকুলেটরের হিসাব মাথায় ঘুরতে থাকে। এই হতাশা থেকেই অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খিটখিটে মেজাজ বা বিষণ্ণতা তৈরি হয়, যা ঈদের আনন্দকে ম্লান করে দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, মধ্যবিত্তের ঈদ মানে এক বিশাল বিসর্জনের নাম। নিজের শখ, আনন্দ আর আরাম বিসর্জন দিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোই হলো এই শ্রেণির মানুষের সার্থকতা। রমজানের বাজার থেকে শুরু করে ঈদের মাংস-পোলাও পর্যন্ত প্রতিটি জিনিসের জোগান দিতে গিয়ে মধ্যবিত্ত সমাজ যে নীরব যাতনা সহ্য করে, তার খবর হয়তো বাইরের সমাজ রাখে না। তবু দিনশেষে ঈদের সকালে যখন সন্তান নতুন জামা পরে হাসিমুখে বাবার হাত ধরে ঈদগাহে যায়, তখন সেই বাবার সব ক্লান্তি আর হতাশা যেন এক নিমেষেই ধুয়ে-মুছে যায়। এই এক চিলতে হাসির জন্যই মধ্যবিত্তরা বছরের পর বছর এই অঘোষিত লড়াই চালিয়ে যায়।