স্বার্থের মানচিত্র ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত: কোন পথে বিশ্ব?

লেখক: এইচ এম হাকিম

বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রের দিকে তাকালে একটি সত্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এখানে আদর্শ, নীতি বা ধর্মের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ অনেক বেশি শক্তিশালী। আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে বন্ধুত্ব কিংবা শত্রুতা স্থায়ী নয়; স্থায়ী কেবল স্বার্থ। যে রাষ্ট্র তার কৌশলগত প্রয়োজন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তার অবস্থানই প্রাধান্য পায়। ফলে আজকের বিশ্বে নৈতিকতার ভাষণ যতটা উচ্চারিত হয়, বাস্তবে ততটাই অনুপস্থিত থেকে যায় তার প্রয়োগ।

আমরা দেখছি, রাশিয়া, চীন কিংবা উত্তর কোরিয়া যখন কোনো ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেখানে ধর্মীয় পরিচয় বা মতাদর্শিক নৈতিকতা মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় না। তাদের অবস্থান নির্ধারিত হয় ক্ষমতার ভারসাম্য, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণে নিজেদের জায়গা সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনে। একইভাবে, ভারত যখন বর্তমান আফগানিস্তান-এর পাশে কৌশলগতভাবে অবস্থান নেয়, তখন সেটিও মূলত আঞ্চলিক স্বার্থের হিসাবেই। এখানে ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু’—এই প্রাচীন নীতিই নতুন রূপে ফিরে আসে। পাকিস্তান-এর প্রভাব বলয়কে দুর্বল করতে ভারত আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে—এটি কেবল কূটনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশল।

যখনই স্বার্থে আঘাত লাগে, তখনই সংঘাতের বীজ রোপিত হয়। শুরু হয় শক্তির লড়াই, অস্ত্র সংগ্রহ, সামরিক মহড়া এবং অর্থনৈতিক অবরোধ। আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ কেবল ময়দানে সীমাবদ্ধ নয়; তা ছড়িয়ে পড়েছে সাইবার জগৎ, অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং তথ্যযুদ্ধের পরিসরেও। ফলে একটি সংঘাতের প্রভাব এখন আর সীমান্তে আটকে থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে বৈশ্বিক অস্থিরতায়।

এই সংঘাতের শিকড় যদি আমরা ইতিহাসের গভীরে খুঁজি, তবে এক করুণ সত্য বেরিয়ে আসে। মুসলিম ও ইহুদি জাতির আদি পিতা হিসেবে পরিচিত হযরত ইব্রাহিম (আ.)—তাঁর দুই পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) এবং হযরত ইসহাক (আ.)-এর বংশধারা ইতিহাসে দুটি বড় জাতিগোষ্ঠীর জন্ম দেয়। ইসমাইল (আ.)-এর বংশধারা থেকে আরব জাতি ও মুসলিম উম্মাহর বিস্তার, অন্যদিকে ইসহাক (আ.)-এর বংশধারা থেকে বনি-ইসরায়েল বা ইহুদি জাতির উৎপত্তি। ইতিহাসের এই প্রেক্ষাপটে তারা আপন আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু বাস্তবতা আজ ভিন্ন। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, সীমান্ত রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদ এই সম্পর্ককে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলইরান-এর দ্বন্দ্ব তারই একটি সমসাময়িক উদাহরণ। এই দ্বন্দ্ব কেবল ধর্মীয় মতপার্থক্য নয়; বরং ক্ষমতার ভারসাম্য, পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব এবং নিরাপত্তা জোটের প্রশ্নে গভীরভাবে প্রোথিত। ইতিহাস যেখানে আত্মীয়তার কথা বলে, বর্তমান সেখানে অস্ত্রের ঝনঝনানি শোনায়। ফলে ‘ভ্রাতৃত্ব’ শব্দটি রাজনৈতিক বাস্তবতায় হারিয়ে যায়।

মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সমীকরণে সবচেয়ে আলোচিত দুটি শক্তি হলো হিজবুল্লাহ এবং হুতি আন্দোলন। লেবাননভিত্তিক হিজবুল্লাহ কেবল একটি সশস্ত্র সংগঠন নয়; এটি একটি রাজনৈতিক শক্তিও, যার সামাজিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তৃত। অপরদিকে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর ঘিরে বৈশ্বিক বাণিজ্যপথকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই সংগঠনগুলোর উত্থান ও কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আঞ্চলিক শক্তিগুলো তাদের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের কৌশল বাস্তবায়ন করছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা ছায়াযুদ্ধ এখন বহুল ব্যবহৃত একটি কৌশল। সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি এড়িয়ে বড় শক্তিগুলো আঞ্চলিক গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করে। এতে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অথচ মূল শক্তিগুলো অনেক সময় নিরাপদ দূরত্বে থাকে। ফলাফল—ধ্বংস, উদ্বাস্তু সংকট, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা অস্থিরতা।

দক্ষিণ এশিয়ায়ও উত্তেজনার কমতি নেই। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ, বিশেষ করে ডুরান্ড লাইন ইস্যু, দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। একই ধর্মীয় পরিচয় থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক স্বার্থ ও নিরাপত্তা উদ্বেগ তাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে—ধর্মীয় ঐক্য রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের নিশ্চয় সমাধান নয়।

প্রশ্ন আসে, এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান কী হওয়া উচিত? একটি উন্নয়নশীল ও জনবহুল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি। একদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখা—এই দুইয়ের সমন্বয়ই কৌশলের মূল। আবেগতাড়িত অবস্থান নয়, বরং বাস্তববাদী ও নীতিনিষ্ঠ কূটনীতিই পারে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে।

বিশ্ব রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো জ্বালানি ও অর্থনীতি। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস সম্পদ বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতাকে তীব্র করেছে। লোহিত সাগর, হরমুজ প্রণালী কিংবা সুয়েজ খালের মতো বাণিজ্যপথে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব পড়ে সারা বিশ্বের বাজারে। মূল্যস্ফীতি বাড়ে, খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে, এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে একটি আঞ্চলিক সংঘাতও হয়ে ওঠে বৈশ্বিক সংকট।

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আরেকটি নতুন যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হয়েছে—তথ্য ও প্রচারযুদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সাইবার আক্রমণ, ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে জনমত প্রভাবিত করা—এসব এখন আধুনিক সংঘাতের অংশ। রাষ্ট্রগুলো কেবল অস্ত্রের শক্তিতে নয়, বরং তথ্যের শক্তিতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়, ঘৃণা বাড়ে এবং সামাজিক মেরুকরণ তীব্র হয়।

এই গোলকধাঁধা থেকে বের হতে হলে প্রয়োজন শিক্ষা ও সচেতনতা। বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিনির্ভর এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষা একটি জাতিকে অন্ধ অনুসরণ থেকে মুক্ত করতে পারে। যখন মানুষ সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করতে শেখে, তখন তারা সহজে বিভ্রান্ত হয় না। তখন ধর্মকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্ব ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে—প্রতিটি বড় যুদ্ধের পরই মানুষ শান্তির মূল্য উপলব্ধি করেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে যেমন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সহযোগিতার ধারণা জন্ম নিয়েছিল, তেমনি বর্তমান সংকটও নতুন কোনো সমঝোতার পথ খুলে দিতে পারে—যদি বিশ্বনেতারা আন্তরিক হন। সমঝোতা মানে আত্মসমর্পণ নয়; বরং পারস্পরিক স্বার্থকে স্বীকার করে সংঘাত কমিয়ে আনা।

পরিশেষে বলা যায়, স্বার্থের সংঘাত মানবসভ্যতার পুরোনো সঙ্গী। কিন্তু সেই স্বার্থ যদি মানবতার উপরে স্থান পায়, তবে তা ধ্বংস ডেকে আনে। আজকের বিশ্বে প্রয়োজন শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং প্রজ্ঞার প্রদর্শন। প্রয়োজন প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতা। মানুষের পরিচয় হোক মানবতা; রাষ্ট্রের পরিচয় হোক দায়িত্বশীলতা। যদি আমরা ইতিহাসের শিক্ষা নিয়ে শান্তি ও সহাবস্থানের পথে হাঁটতে না পারি, তবে এই পৃথিবী ধ্বংসের দিকেই এগোবে।

যুদ্ধের দামামা নয়, বরং জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই হতে পারে এই অন্ধকার সময়ের মুক্তির আলো। মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি—এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা। স্বার্থের মানচিত্র বদলাতে সময় লাগবে, কিন্তু মানবতার মানচিত্র আঁকতে এখনই শুরু করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *