ওএমএসের চাল-আটা বিক্রিতে অনিয়ম—কামরাঙ্গীরচরে দুই ডিলারের দোকান সিলগালা, এক গ্রেফতার

স্টাফ রিপোর্টার:

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে সরকারি ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) কার্যক্রমে চাল ও আটা বিক্রিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে দুই ডিলারের দোকান সিলগালা করেছে খাদ্য অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ অভিযান দল। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল ২০২৬) পরিচালিত এই অভিযানে বিপুল পরিমাণ চাল ও আটা জব্দ করা হয় এবং একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অভিযানে সিলগালা করা ডিলাররা হলেন—মোঃ সোহেল (৭৫, পশ্চিম বড়গ্রাম, কামরাঙ্গীরচর) এবং মোঃ আরিফুর ইসলাম (১৫, টেকেরহাটি, কামরাঙ্গীরচর)। ডি/৪ রেশনিং এলাকার আওতায় পরিচালিত এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ) এর নেতৃত্বাধীন একটি বিশেষ টিম। অভিযানে উপস্থিত ছিলেন রেশনিং কর্মকর্তা তারিকুজ্জামান এবং সহকারী নিয়ন্ত্রক ঈমানা শাহরীনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

অভিযান চলাকালে অভিযোগ ওঠে, ওএমএসের জন্য বরাদ্দকৃত চাল ও আটা নির্ধারিত স্থানে বিক্রি না করে গোপনে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। এতে সাধারণ নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্যপণ্য কালোবাজারে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অভিযানে জব্দ করা খাদ্যপণ্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ডিলারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।

এদিকে অভিযানের পেছনে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ, ডি/৪ রেশনিং এলাকার কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ডিলারদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে, যা এই অনিয়মকে দীর্ঘদিন ধরে আড়াল করে আসছিল। বিশেষ করে রেশনিং কর্মকর্তা তারিকুজ্জামান ও ইন্সপেক্টর হাদী ইমরুলের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে অন্য ডিলার সোহেলের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযানে আরও জানা যায়, ডি/৪ এলাকার আরেক কর্মকর্তা মামুন তার নিজ ছোট ভাইয়ের নামে ডিলারশিপ পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ডিলার রমিজ উদ্দিন কায়েসের দোকানেও অভিযান চালানো হয়, যেখানে অনিয়মের বিভিন্ন প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কিছু কর্মকর্তা প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে ঘুষের মাধ্যমে পদে বহাল রয়েছেন এবং এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ওএমএস কার্যক্রমে অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে রাজধানীর ডি/১ রেশনিং এলাকাতেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জানা যায়, ধনিয়া ছাপড়া মসজিদ সংলগ্ন জিয়া স্মরণী এলাকায় ওএমএস ডিলার আল আমিন মিরার বিক্রয় পয়েন্টে ৭ এপ্রিল বিকেলে ট্রাকসেল কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগেই বিপুল পরিমাণ চাল ও আটা অবিক্রীত অবস্থায় অন্য একটি গুদামে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে খালি ট্রাকে ওএমএসের ব্যানার লাগিয়ে ভিডিও ধারণ করে তা কন্ট্রোল রুমে পাঠানো হয়, যা পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু অনিয়ম নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের অংশ, যেখানে ডিলার ও কিছু অসাধু কর্মকর্তা মিলে সরকারি খাদ্যপণ্য আত্মসাৎ করছে। এতে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

অভিযান পরিচালনাকারী দলের নেতৃত্বে ছিলেন মোঃ সেলিমুল আজম। তিনি জানান, ওএমএস কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। একইসঙ্গে তিনি সকল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন এবং অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।

স্থানীয়দের দাবি, ওএমএস কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই কর্মসূচি তার উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়বে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা হারাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *