মোঃ আনজার শাহ:
ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হলো এক নতুন অধ্যায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অক্লান্ত সংগ্রাম আর বহু স্বপ্নের পথ পেরিয়ে অবশেষে নিজস্ব উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ পেল বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় শহর কুমিল্লা।
গত ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ‘কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল-২০২৬’ পাস হওয়ার মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই নবগঠিত এই কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দিয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খলিল আহমেদ। এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—সংক্ষেপে সিডিএ—আনুষ্ঠানিকভাবে তার ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু করল। লাখো কুমিল্লাবাসীর বহু বছরের লালিত স্বপ্ন আজ বাস্তবের মাটিতে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে।
বিল পাসের আগেই প্রস্তুত ছিল মন্ত্রণালয়
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সংসদে বিল পাসের আগে থেকেই গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পূর্ণ প্রশাসনিক প্রস্তুতি গুছিয়ে রেখেছিল। বিল পাসের সঙ্গে সঙ্গেই যাতে কর্তৃপক্ষ দ্রুত ও কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করতে পারে, সে লক্ষ্যে আগেভাগেই চেয়ারম্যান পদের জন্য যোগ্য প্রার্থী বাছাই ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়েছিল।
এই সুপরিকল্পিত পূর্বপ্রস্তুতি ও প্রশাসনিক দক্ষতাই বিল পাসের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে নিয়োগ সম্ভব করে তুলেছে। বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে নতুন কোনো সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ গঠনের পর জনবল নিয়োগ ও সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড় করাতে সাধারণত মাসের পর মাস, এমনকি বছরও পেরিয়ে যায়। সেই দীর্ঘসূত্রতার বিপরীতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এই অসাধারণ তৎপরতা প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল নজির হিসেবে স্থান পেয়েছে।
কে এই খলিল আহমেদ?
নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান খলিল আহমেদ গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একজন অভিজ্ঞ, দক্ষ ও পরীক্ষিত প্রশাসক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই সুনামের সঙ্গে পরিচিত। অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নগর অবকাঠামো উন্নয়ন, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ বিষয়ে তাঁর গভীর পেশাদারি দক্ষতা ও সমৃদ্ধ বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
দীর্ঘ কর্মজীবনে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে তিনি নিজেকে একজন বিশ্বস্ত, নিষ্ঠাবান ও যোগ্য কর্মকর্তা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নগর উন্নয়নে তাঁর অসাধারণ পারদর্শিতা এবং মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দীর্ঘ কর্মসম্পৃক্ততাই তাঁকে সিডিএর প্রথম চেয়ারম্যান পদের জন্য সর্বোচ্চ যোগ্য ও উপযুক্ত প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত করেছে। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন, তাঁর নেতৃত্বে সিডিএ দ্রুতই কুমিল্লার নগর উন্নয়নে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
কী করবে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ?
কুমিল্লা শহর ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার সুশৃঙ্খল, পরিকল্পিত ও আধুনিক নগর উন্নয়ন নিশ্চিত করাই হবে এই কর্তৃপক্ষের কেন্দ্রীয় দায়িত্ব। এর আওতায় যেসব কার্যক্রম পরিচালিত হবে—
মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন: কুমিল্লা শহর ও আশপাশের এলাকার সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন।
ভূমি উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ: অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত ভূমি ব্যবহার রোধ করে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে জমির সর্বোচ্চ ও সুষম সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা।
নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি: রাস্তাঘাট, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ প্রতিটি মৌলিক নগর সেবার মানসম্পন্ন আধুনিকায়ন ও পরিধি সম্প্রসারণ।
আবাসন পরিকল্পনা: শহরের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কথা মাথায় রেখে সুষম ও সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা।
পরিবেশ সংরক্ষণ: নগর উন্নয়নের প্রতিটি পদক্ষেপে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রাকৃতিক জলাশয় ও সবুজ বেষ্টনী সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
আধুনিক নগরায়ণ: সামগ্রিকভাবে কুমিল্লাকে একটি পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও সম্পূর্ণ বাসযোগ্য আধুনিক শহরে রূপান্তরিত করা।
যে কারণে কুমিল্লার জন্য সিডিএ এত জরুরি ছিল
বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন, সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী শহর কুমিল্লা। ঐতিহাসিক, বাণিজ্যিক ও ভৌগোলিক দিক থেকে এই শহরের গুরুত্ব সর্বজনস্বীকৃত। অথচ বছরের পর বছর ধরে অপরিকল্পিত নগরায়ণের করাল গ্রাসে পড়েছে এই শহর।
যানজট, জলাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত বিশৃঙ্খলা এবং সুষম ভূমি ব্যবস্থাপনার অভাবে শহরটির স্বাভাবিক বিকাশ দিনের পর দিন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনার মতো শহরগুলো নিজস্ব উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সুবাদে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল। অথচ এই শহরগুলোর চেয়ে কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয় কুমিল্লা; তবু দীর্ঘদিন এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়েছে এই শহরকে।
এবার সেই দীর্ঘ বঞ্চনা ও অপেক্ষার সুখকর অবসান হলো। স্থানীয় সুধীজন, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং সর্বস্তরের নাগরিকরা এই ঐতিহাসিক উদ্যোগকে উষ্ণ অভিনন্দন ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী যে, নবগঠিত এই কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে কুমিল্লার চেহারা আমূলভাবে বদলে দিতে সক্ষম হবে।
গৃহায়নমন্ত্রীর দূরদর্শিতায় কুমিল্লার নতুন সূচনা
কুমিল্লার নিবেদিতপ্রাণ সংসদ সদস্য এবং গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের অদম্য প্রচেষ্টা, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং কুমিল্লার উন্নয়নে তাঁর গভীর আন্তরিকতার ফলেই এই ঐতিহাসিক বিলটি সংসদে পাস হয়েছে বলে জানা গেছে।
শুধু বিল পাস করেই থেমে থাকেননি তিনি—বিল পাসের পরদিনই চেয়ারম্যান নিয়োগের মধ্য দিয়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় জাতির সামনে সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—কুমিল্লার উন্নয়ন এখন আর কেবল প্রতিশ্রুতি বা কাগজে-কলমের পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ নয়; তা দৃশ্যমান ও অপ্রতিরোধ্য বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা একবাক্যে মন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের এই সাহসী ও দূরদর্শী উদ্যোগকে কুমিল্লার উন্নয়নের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করছেন। নতুন এই কর্তৃপক্ষের হাত ধরে কুমিল্লা একদিন বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিকল্পিত ও আধুনিক শহরগুলোর একটি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে—এই প্রত্যয়ে বুক বাঁধছেন কুমিল্লার লাখো স্বপ্নবাজ মানুষ।