স্টাফ রিপোর্টার:
খুলনা আঞ্চলিক সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পে কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সহকারী পরিচালক ও উপপরিচালক পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, স্বজনপ্রীতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম এবং সুবিধাভোগীদের হয়রানির অভিযোগ স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগ উঠলেও কার্যকর তদন্ত না হওয়ায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে প্রশাসনিক ও দুর্নীতি দমন সংস্থার ভূমিকা নিয়ে।
সূত্রমতে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতায় খুলনা অঞ্চলে বাস্তবায়িত সামাজিক নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন প্রকল্পগুলোতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ থাকলেও তার সঠিক ব্যবহার নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রকল্পে কাগজে-কলমে কাজ দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। কোথাও আবার উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, আবার একই ব্যক্তিকে একাধিক প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষরা অনেক ক্ষেত্রে তালিকা থেকে বাদ পড়ছেন। অন্যদিকে প্রভাবশালী মহল ও ঘনিষ্ঠদের অগ্রাধিকার দিয়ে তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। উপকারভোগী হতে হলে অনেক ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন বা বিশেষ সুপারিশ প্রয়োজন হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, সরকারি ভাতা ও সহায়তা পেতে গিয়ে তারা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বারবার অফিসে যেতে হয়, কাগজপত্রে অযথা জটিলতা তৈরি করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, ভুয়া উপকারভোগী তালিকা, নিম্নমানের কাজ এবং অর্থ আত্মসাতের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এতসব অভিযোগ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো তদন্ত শুরু না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর নীরব ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা চলছে। সচেতন মহল মনে করছে, গুরুত্বপূর্ণ এই সামাজিক নিরাপত্তা খাতে দুর্নীতি হলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল।
অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু কর্মকর্তা অভিযোগগুলোকে আংশিক সত্য বলে দাবি করলেও পুরো অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের মতে, কিছু অনিয়ম থাকলেও তা তদন্তসাপেক্ষ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত অডিট এবং কঠোর নজরদারি জরুরি। না হলে এ ধরনের অনিয়ম আরও বিস্তৃত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগগুলো যাচাই করা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাবে।
সর্বশেষ, খুলনা আঞ্চলিক সমাজসেবা অধিদপ্তরের এসব অভিযোগ এখন শুধু একটি প্রশাসনিক ইস্যু নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা এবং দরিদ্র পুনর্বাসন প্রকল্প অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এসব কর্মসূচির সুবিধা প্রকৃত যোগ্যদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। বরং মধ্যস্বত্বভোগী ও দালাল চক্রের মাধ্যমে বড় অংশের অর্থ অপচয় হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, মাঠপর্যায়ের জরিপ ছাড়াই তালিকা তৈরি করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সুপারিশে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এছাড়া বিভিন্ন প্রকল্পের অডিট রিপোর্ট গোপন রাখা বা আংশিক প্রকাশ করার অভিযোগও উঠেছে, যা স্বচ্ছতা নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি করেছে। স্থানীয় সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, দ্রুত এই অনিয়ম তদন্ত না করলে পুরো সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
তাদের দাবি, প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্ধারণে ডিজিটাল ডাটাবেজ শক্তিশালী করা, নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে এই খাতে অনিয়ম আরও গভীর হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে দ্রুত হস্তক্ষেপ না এলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রতি জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এছাড়া নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, শুধু তদন্ত নয়, পুরো প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনা জরুরি। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন মনিটরিং সেল গঠন এবং নিয়মিত জনশুনানির ব্যবস্থা করা হলে অনিয়ম অনেকাংশে কমে আসতে পারে।
গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—দুদক দ্রুত সক্রিয় হয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু করবে এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্নীতি রোধে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জোরালো হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে খুলনা অঞ্চলের সমাজসেবা অধিদপ্তরের কার্যক্রম নিয়ে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন সময় এসেছে কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণের। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ, দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান এবং স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে জনগণের অংশগ্রহণ ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী ভূমিকা আরও জোরদার করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার হয়।
এছাড়া বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের অনিয়ম দমন করতে শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন অপরিহার্য। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক তদারকি কমিটি গঠন করা গেলে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দুর্নীতির সুযোগ কমে আসবে। সরকার যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই খাতের ওপর জনগণের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে।