নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
রাজধানীর মিরপুরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর এক ঘটনার অভিযোগ উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে অপপ্রচারমূলক পোস্টার লাগানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় এক ফায়ার ফাইটারকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। এ ঘটনায় প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী আবদুল হান্নান (৪৩) বুধবার (২২ এপ্রিল ২০২৬) মিরপুর মডেল থানায় একটি জিডি দায়ের করেন। জিডি নং-২৭০৪ (ট্র্যাকিং: F8PXG3)। জিডিতে অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মোঃ কামাল (৪২), যিনি ডেমরা ফায়ার স্টেশনের ফায়ার ফাইটার হিসেবে কর্মরত, এবং মোঃ খায়রুল আলম (৩৬), যিনি কালীগঞ্জ ফায়ার স্টেশনের স্টেশন অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জিডিতে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত কামাল ভুক্তভোগীকে ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে অপপ্রচারমূলক ব্যানার ও পোস্টার লাগানোর প্রস্তাব দেন। এ কাজের জন্য মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিকাশের মাধ্যমে অর্থ প্রদানের আশ্বাসও দেন তিনি। তবে ভুক্তভোগী এ ধরনের বেআইনি ও অনৈতিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে অভিযুক্ত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর কামাল একাধিকবার হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কল করে ভুক্তভোগীকে ভয়ভীতি দেখান এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন। জিডিতে উল্লেখ রয়েছে, গত ১৭ এপ্রিল সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা ১০ মিনিটে সরাসরি হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগী আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন।
এদিকে অপর অভিযুক্ত খায়রুল আলমের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। জিডিতে বলা হয়, তিনি ঘটনাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানানোর জন্য ভুক্তভোগীর ওপর চাপ প্রয়োগ করেন এবং বিষয়টি প্রকাশ পেলে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির হুমকি দেন। এতে করে ভুক্তভোগী আরও বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকেন।
ভুক্তভোগী আরও জানান, পরবর্তীতে অপরিচিত একটি নম্বর থেকেও তাকে হুমকি দেওয়া হয় এবং অশোভন ভাষায় কথা বলা হয়। এতে তার ও তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। তিনি বলেন, বর্তমানে তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না এবং প্রতিনিয়ত উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
জিডিতে আরও উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত কামাল দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। ভুক্তভোগীর দাবি, কামাল নিজেকে সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের ঘনিষ্ঠ বলে দাবি করতেন এবং তাকে ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করতেন। একইসঙ্গে সাবেক জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের স্ত্রী মোনালিসা রহমানের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকার কথাও প্রচার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও অভিযুক্ত কামালের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের কেউ কেউ তাকে ‘ফায়ার সার্ভিসের ক্যান্সার’ বলেও অভিহিত করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজে হস্তক্ষেপ করতেন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা চালাতেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, কামাল বঙ্গভবনের প্রভাব ব্যবহার করে মন্ত্রণালয়ের এক প্রশাসনিক কর্মকর্তার মাধ্যমে এক লাখ টাকার বিনিময়ে পদক গ্রহণ করেছেন। একইসঙ্গে তিনি বিভিন্ন সময় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স নিয়ে উদ্দেশ্যমূলক লেখালেখি করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগেও অভিযুক্ত।
আরও জানা গেছে, তিনি নিয়মিত দায়িত্বস্থলে উপস্থিত না থেকে বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরা করেন এবং নিজেকে তথাকথিত ‘ম্যাচ ম্যানেজার’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তারে লিপ্ত থাকেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন তদবির বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও রয়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ও পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অপসারণের ষড়যন্ত্রের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি ফায়ার সার্ভিসে নিয়োগ সংক্রান্ত একটি সিন্ডিকেটের কাছ থেকে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা গ্রহণ করেছেন তিনি, এই মর্মে যে তিনি ডিজি ও পরিচালকদের পরিবর্তন করাতে সক্ষম হবেন। তবে পরে সেই অর্থ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়াও ফায়ার সার্ভিসের ৩৩ জন ড্রাইভার, ফায়ার ফাইটার ও লিডারদের বদলি করিয়ে দেওয়ার কথা বলে প্রায় ৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তিনি এসব অর্থ ফেরত দিচ্ছেন না এবং বিভিন্ন অজুহাত দেখাচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, তার এসব কর্মকাণ্ডের কারণে ফায়ার সার্ভিসের অভ্যন্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং শৃঙ্খলা বিনষ্ট হচ্ছে। তিনি নিয়মিত বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন এবং বর্তমান মহাপরিচালক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে তার বিরুদ্ধে একাধিকবার বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তিনি প্রভাব খাটিয়ে তা এড়িয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। এমনকি তাকে দূরবর্তী স্থানে বদলি করা হলেও তিনি ঢাকায় অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হন।
তথ্য অনুযায়ী, ২০ আগস্ট ২০২৪ তারিখে তাকে কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া ফায়ার স্টেশনে বদলি করা হয়। তবে তিনি সেখানে যোগদান করেননি। পরবর্তীতে ২৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে সেই বদলি আদেশ বাতিল করা হয় এবং তিনি পুনরায় পূর্বের স্থানে বহাল থাকেন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে তিনি নিয়মিত বঙ্গভবনে যাতায়াত করতেন এবং সেই প্রভাব ব্যবহার করে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন। এমনকি তার ছোট ভাইকেও রাষ্ট্রপতির প্রভাব খাটিয়ে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে ওই ব্যক্তি গাজীপুরে কর্মরত রয়েছেন।
এছাড়াও তার বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, তার বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলায় হলেও তিনি ভুয়া কোটার মাধ্যমে বগুড়া থেকে চাকরিতে যোগদান করেছেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, সাবেক সরকার প্রধান দেশ ত্যাগের পরও অভিযুক্তরা নতুন পরিস্থিতিতেও পুরনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে তৎকালীন মহাপরিচালককে ফোন করিয়ে ভুক্তভোগীকে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
বর্তমানে চাকরি হারানো ভুক্তভোগী আবদুল হান্নান তার চাকরি পুনর্বহালের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তিনি ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন।
তিনি দ্রুত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তার ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে অভিযুক্ত কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আপনি নিউজ করেন, তাতে আমার কিছু যায় আসে না।”