মোঃআনজার শাহ:
আজ মহান আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। বিশ্বের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের এই ঐতিহাসিক দিনে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে এক বর্ণাঢ্য র্যালি। বরুড়া উপজেলা নির্মাণ শ্রমিক এসোসিয়েশন আয়োজিত এই র্যালিতে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার হন শত শত নির্মাণ শ্রমিক। র্যালিটি এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং সচেতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
র্যালির আয়োজন ও নেতৃত্ব:
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এই বর্ণাঢ্য র্যালিতে সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। র্যালিতে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা আক্তার হায়দার, সভাপতি আবদুল কাইয়ুম মোল্লা, সিনিয়র সভাপতি আবদুল মান্নান এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহিম। এ ছাড়া সহসভাপতি মো. কবির হোসেন, মো. সোলেমান, মো. নুরু, আবদুস সামাদ ও মো. মনির হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা অরুণ, সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিবুল বাশার হাবিব, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হোসেন, কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ আলী, দপ্তর সম্পাদক মনির হোসেন, প্রচার সম্পাদক আবুল কাশেম এবং সহ-প্রচার সম্পাদক শহীদুল্লাহসহ সংগঠনের সকল স্তরের নেতাকর্মীবৃন্দ র্যালিতে অংশগ্রহণ করেন।
রক্তে লেখা ইতিহাস, মে দিবসের জন্ম যেভাবে:
মে দিবস কেবল একটি দিবস নয়, এটি লক্ষ শ্রমিকের রক্ত, ঘাম ও আত্মত্যাগের এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস। উনিশ শতকের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রে শিল্পবিপ্লবের জোয়ারে কারখানাগুলোতে উৎপাদন বাড়লেও শ্রমিকদের জীবন ছিল চরম দুর্বিষহ। দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হতো, মজুরি ছিল নামমাত্র আর কর্মস্থলে নিরাপত্তার কোনো বালাই ছিল না।
১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রায় ৩ লাখ শ্রমিক ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে একযোগে ধর্মঘটে নামেন। শিকাগো হয়ে ওঠে সেই আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। ৩ মে পুলিশের গুলিতে অন্তত ৬ জন শ্রমিক প্রাণ হারান। পরদিন ৪ মে হে-মার্কেট স্কয়ারে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণের পর পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে বহু শ্রমিক নিহত হন। অভিযুক্ত ৮ নেতার মধ্যে সরাসরি প্রমাণ না থাকলেও পক্ষপাতদুষ্ট বিচারে ৪ জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। সেই রক্তের বিনিময়েই ১৮৮৯ সালে প্যারিসে ১ মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশে শ্রমিকের বাস্তব অবস্থা, অধিকার আজও অধরা:
বাংলাদেশে নির্মাণ, পোশাক, পরিবহন ও কৃষিখাতে কোটি কোটি শ্রমিক প্রতিদিন ঘাম ঝরাচ্ছেন। দেশের অর্থনীতির চাকা তাঁদের হাতেই সচল থাকে, রাস্তা-সেতু-ভবন সবকিছুই গড়ে উঠছে তাঁদের শ্রমে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিশাল শ্রমজীবী মানুষগুলোর বড় একটি অংশ আজও ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত।
বিশেষ করে নির্মাণ শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। উঁচু ভবন, ভারী যন্ত্রপাতি ও বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে প্রতি বছর অনেক নির্মাণ শ্রমিক হতাহত হচ্ছেন। অথচ তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তাসরঞ্জাম, বিমা সুবিধা কিংবা চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।
শ্রম আইনে শ্রমিকদের অনেক অধিকার স্বীকৃত থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত। নিয়মিত নির্মাণস্থল পরিদর্শন না হওয়া, তদারকিতে দুর্নীতি এবং মালিকপক্ষের একচেটিয়া প্রভাবের কারণে শ্রমিকরা বারবার তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একজন শ্রমিক যখন কাজে যোগ দেন, তখন তাঁর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মালিকপক্ষের আইনগত ও নৈতিক উভয় দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে সেই দায়িত্ব বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে।
নির্মাণ শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি:
বরুড়া উপজেলা নির্মাণ শ্রমিক এসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ জানান, নির্মাণ শ্রমিকরা দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে যে অতুলনীয় ভূমিকা রাখছেন, তার বিপরীতে তাঁরা পাচ্ছেন সবচেয়ে কম সুরক্ষা। তাই এবারের মে দিবসে তাঁরা সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি তুলে ধরেছেন।
নির্মাণস্থলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাসরঞ্জাম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। প্রতিটি শ্রমিকের জন্য ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে এবং নিয়মিত মজুরি পরিশোধ বাধ্যতামূলক করতে হবে। নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও বিমা সুবিধা চালু করতে হবে। সর্বোপরি শ্রমিক সংগঠনের কার্যক্রমকে সহযোগিতা করতে হবে এবং শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
মে দিবসের অঙ্গীকার, শ্রমিকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই লক্ষ্য:
বরুড়ার এই বর্ণাঢ্য র্যালি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি শ্রমিকদের জেগে ওঠার এক সাহসী প্রতীক। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ দৃঢ়কণ্ঠে জানান, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
মে দিবস আমাদের কেবল অতীতের সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয় না, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের দায়িত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়। একটি সভ্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো তার প্রতিটি শ্রমিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা। শ্রমিককে কেবল উৎপাদনের হাতিয়ার হিসেবে নয়, একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে।
যতদিন একজনও শ্রমিক অনিরাপদ কর্মস্থলে প্রাণ হারাবেন, যতদিন একজনও শ্রমিক ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত থাকবেন ততদিন মে দিবসের প্রকৃত বিজয় অর্জিত হয়নি। শ্রমিকের ঘামে গড়া এই দেশে শ্রমিকই যেন সবচেয়ে বঞ্চিত না হন এটাই হোক এবারের মে দিবসের সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি।
“সফল হোক, সার্থক হোক, মহান মে দিবস ২০২৬”