স্টাফ রিপোর্টার:
চুয়াডাঙ্গা বিআরটিএ অফিসে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। লাইসেন্স প্রদান, গাড়ির ফিটনেস সনদ, রেজিস্ট্রেশন এবং বিভিন্ন সেবা কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংগঠিত চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ভেতরে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততায় এসব অনিয়ম চলছে—এমন অভিযোগ স্থানীয় সেবা গ্রহীতা ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি নির্ধারিত ফি থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও ফাইল ক্লিয়ার, প্রসেসিং ও দ্রুত অনুমোদনের নামে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অফিসের ভেতরে এবং বাইরে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের সদস্যরা সেবা প্রত্যাশীদের সরাসরি অফিসে না গিয়ে তাদের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে উৎসাহিত করে। এরপর বিভিন্ন ধাপে টাকা আদায় করে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হয়। ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে এসব দালালের শরণাপন্ন হচ্ছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ফিটনেস সনদ প্রদানের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়ম চলছে। যানবাহনের প্রকৃত অবস্থা যাচাই না করেই অর্থের বিনিময়ে সনদ প্রদান করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন পরিবহন মালিক। এতে রাস্তায় অনিরাপদ ও অযোগ্য যানবাহন চলাচলের ঝুঁকি বাড়ছে, যা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সেবা গ্রহীতা জানান, দালাল ছাড়া কোনো কাজই দ্রুত সম্পন্ন হয় না। তারা বলেন, সরাসরি অফিসে গেলে বিভিন্ন অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়, কাগজপত্রে ত্রুটি দেখানো হয় কিংবা বারবার ঘুরতে বলা হয়। কিন্তু একই কাজ দালালের মাধ্যমে করলে তুলনামূলকভাবে দ্রুত সম্পন্ন হয়, যদিও অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়।
পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধরনের অনিয়মের কারণে বৈধ প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক চালক বাধ্য হয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন, যা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এছাড়া রেজিস্ট্রেশন ও নামজারির ক্ষেত্রেও বিলম্ব ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা না পাওয়ায় আবেদনকারীদের বারবার অফিসে আসতে হচ্ছে, যা সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে এই কারণে যে, “অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের নাম দ্বিতীয় পর্বে প্রকাশ পাবে”—এমন তথ্য বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়েছে। জানা গেছে, একটি অনুসন্ধানী প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা ও সম্পৃক্ততা যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী ধাপে কারা এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, এটি শুধু নিম্নস্তরের অনিয়ম নয়, বরং একটি সুসংগঠিত চক্রের মাধ্যমে পুরো সেবাব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। তাদের মতে, শুধু অভিযোগ নয়, কার্যকর তদন্তের মাধ্যমে পুরো সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করা জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই দ্রুত তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিআরটিএ সেবা ডিজিটালাইজড হলেও বাস্তবে দালাল নির্ভরতা ও দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের অনিয়ম রোধে কেবল প্রশাসনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। বরং সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা জরুরি। অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো এবং অভিযোগ জানানোর জন্য কার্যকর হটলাইন বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ তদন্ত ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী অনিয়মে জড়িত হলে দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
চুয়াডাঙ্গা বিআরটিএ অফিসের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। তারা মনে করছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই অনিয়ম আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সব মিলিয়ে চুয়াডাঙ্গা বিআরটিএ অফিসের এই অনিয়মের অভিযোগ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
এই অনিয়মের সাথে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম প্রকাশ পাবে ২য় পর্বে।