হাটহাজারী প্রতিনিধি:
দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী–কে ঘিরে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। নদী থেকে সংগ্রহ করা রুইজাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম থেকে উৎপাদিত পোনা বিক্রি শুরু হওয়ায় এলাকায় ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে হালদা নদী থেকে সংগৃহীত ডিম হ্যাচারিতে সংরক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে সফলভাবে পোনা উৎপাদন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৫ মে) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পোনা বিক্রি শুরু হয়েছে, যা আগামী কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বছর গতবারের তুলনায় ডিম আহরণ কিছুটা কম হলেও বাজারে পোনার চাহিদা বেশি থাকায় দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি পোনা ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে মান ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দামে কিছুটা তারতম্য দেখা যাচ্ছে। মাছুয়াঘোনা হ্যাচারিসহ কয়েকটি স্থানে তুলনামূলক কম দামে, প্রতি কেজি ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫ হাজার টাকায় পোনা বিক্রির খবরও পাওয়া গেছে।
হাটহাজারীর বিভিন্ন হ্যাচারিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ক্রেতাদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। অনেকেই সরাসরি হ্যাচারিতে এসে পোনা ক্রয় করছেন, আবার কেউ কেউ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আগাম দরদাম চূড়ান্ত করছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ও হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া জানান, এ বছর প্রায় ৬ হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে, যা থেকে আনুমানিক ১৫৫ কেজি পোনা উৎপাদন সম্ভব। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতি কেজি পোনা ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ধরে এ মৌসুমে প্রায় ২ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে।
হাটহাজারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শওকত আলী বলেন, মা মাছ আগেভাগে ডিম ছাড়ায় এ বছর উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছে। তবে ডিমের মান ভালো হওয়ায় উৎপাদিত পোনার গুণগত মানও উন্নত হয়েছে, ফলে বাজারে এর চাহিদা বেড়েছে। তিনি আরও জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। পানি ও বিদ্যুৎসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং বাইরের পোনা এনে প্রতারণা রোধে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে।
ডিম সংগ্রহকারী কামাল উদ্দিন সওদাগর বলেন, “এ বছর ডিম কিছুটা কম পেলেও বাজারে চাহিদা বেশি থাকায় ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। আমি ১২ বালতি ডিম সংগ্রহ করেছি, যা থেকে প্রায় ৩ কেজি পোনা পাওয়া যাবে। প্রতি কেজি ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দরে বিক্রির বায়না করেছি। কিছু পোনা নিজের পুকুরেও চাষ করব।”
সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে হাটহাজারীকে কেন্দ্র করে প্রায় ২ কোটি টাকার পোনা বাণিজ্য হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন হ্যাচারিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পোনা বিক্রি হয়েছে এবং লেনদেন ক্রমেই বাড়ছে।
তবে কিছু অসাধু চক্র পোনার সঙ্গে ভেজাল মেশানোর চেষ্টা করতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। এ বিষয়ে মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, নিয়মিত তদারকি চলছে এবং মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, হালদা নদী–এর এই প্রাকৃতিক সম্পদ সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আরও উন্নত করা গেলে ভবিষ্যতে দেশের মৎস্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।