রাঙ্গাবালীতে সরকারি খাস খাল উন্মুক্তের দাবিতে মানববন্ধন

মোঃ জাহাঙ্গীর আলম হাওলাদার:

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার সদর ইউনিয়নের যুগিরহাওলা ও হাপুয়াখালী গ্রামের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত ‘মকপাড়া সরকারি খাস খাল’ উন্মুক্ত করার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দীর্ঘদিন ধরে খালটি প্রভাবশালী একটি চক্রের দখলে রেখে মাছ চাষ করার অভিযোগ তুলে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য খালটি দ্রুত উন্মুক্ত করার দাবি জানান তারা।

বৃহস্পতিবার বিকেলে খালের হাপুয়াখালী পাড়ে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে শতাধিক নারী-পুরুষ অংশ নেন। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া গ্রামবাসীরা খাল দখল ও ইজারার নামে সাধারণ মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, একসময় এই খাল ছিল এলাকার মানুষের জীবিকা, কৃষিকাজ ও দৈনন্দিন ব্যবহারের অন্যতম ভরসা। কিন্তু বর্তমানে মাছ চাষের কারণে সাধারণ মানুষ খালের স্বাভাবিক ব্যবহার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর ধরে একটি প্রভাবশালী মহল যুগিরহাওলা মৌজার প্রায় ১২ একর জমির এই খালটি দখলে নিয়ে মাছ চাষ করে আসছে। এর ফলে আশপাশের অন্তত দুই শতাধিক পরিবার নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া বাসিন্দারা জানান, খালটির দুই পাড়ের অধিকাংশ মানুষ কৃষি ও মৎস্য পেশার সঙ্গে জড়িত। মাছ চাষের জন্য খালে নোনা পানি প্রবেশ করানো হয়। ফলে সেই পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। এতে কৃষিজমিতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক কৃষক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

গ্রামবাসীরা আরও জানান, একসময় স্থানীয়রা এই খাল থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এছাড়া গৃহস্থালি বিভিন্ন কাজেও খালের পানি ব্যবহার করা হতো। কিন্তু বর্তমানে মাছ চাষের জন্য খালটি কার্যত সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা দাবি করেন, সবশেষ খালটি তিন বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। তারা অবিলম্বে সেই ইজারা বাতিল করে জনস্বার্থে খালটি উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে স্থানীয় সাধারণ মানুষের অবাধ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

ক্লাইমেট অ্যাকশন গ্রুপ (সিএজি) ও ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে আয়োজিত এ মানববন্ধনে বক্তব্য দেন হাপুয়াখালী গ্রামের কৃষক শাহজাহান প্যাদা, মিঠন হাওলাদার, মনির মাতুব্বর, মহসিন প্যাদা ও গৃহিণী নাসিমা বেগমসহ আরও অনেকে।

বক্তারা বলেন, সরকারি খাল জনগণের সম্পদ। এটি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক ভোগদখলের বিষয় নয়। খাল উন্মুক্ত না থাকায় এলাকার কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।

এদিকে খালটির ইজারাগ্রহীতা পক্ষের স্থানীয় বাসিন্দা শাকিল তালুকদার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “২০০৬ সালে বিএস জরিপে খালটি খাস হিসেবে জেলা প্রশাসকের নামে অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীতে বাংলা ১৪৩২ থেকে ১৪৩৪ সাল পর্যন্ত তিন বছরের জন্য জলমহাল ইজারা দেওয়ার লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওই দরপত্রে পাঁচজন আবেদন করেন। এর মধ্যে মজিবর খার নেতৃত্বাধীন মৎস্য সমিতি সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে খালটির ইজারা পায়। একটি পক্ষ ইজারা না পেয়ে এখন আমাদের হয়রানির চেষ্টা করছে।”

তবে এলাকাবাসীর দাবি, ইজারার নামে দীর্ঘদিন ধরে খালটির স্বাভাবিক পরিবেশ ও জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। তারা প্রশাসনের কাছে দ্রুত তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খায়রুল হাসান বলেন, “খালটি নিয়ে আদালতে একটি মামলা চলমান রয়েছে বলে জেনেছি। আদালতের সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

সরকারি খাল উন্মুক্তের দাবিতে স্থানীয়দের এই আন্দোলন এখন পুরো এলাকায় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এলাকাবাসীর আশা, প্রশাসন দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে এবং জনগণের স্বার্থে খালটি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *