এইচ এম হাকিম:
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটি আমাদের সমাজের এক বীভৎস ও মেরুদণ্ডহীন চিত্রকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে। গত ১৬ মাসে (জানুয়ারি ২০২৫ থেকে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত) দেশে অন্তত ১ হাজার ৮৯০ জন শিশু ও কিশোরী চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৫৮০টি শিশু ধর্ষণের শিকার এবং ৪৮৩ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি আরও ৩১৮ জন শিশু চরম যৌন নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল কিছু সংখ্যা মাত্র নয়; এগুলো একেকটি নিভে যাওয়া প্রাণ, একেকটি পরিবারের আজীবন কান্নায় ভেঙে পড়ার গল্প এবং একটি সভ্য সমাজের চূড়ান্ত নৈতিক দেউলিয়াত্বের অকাট্য দলিল। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেখানে রাষ্ট্রের একটি মৌলিক সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব, সেখানে একের পর এক ঘটে যাওয়া এসব রোমহর্ষক ঘটনা প্রমাণ করে যে, আমাদের বিদ্যমান শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর এবং অকার্যকর।
বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠন এসব অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আসলেও, বাস্তবে এর প্রাপ্তি যেনো শূন্যের কোঠায় এসে ঠেকেছে। মূলত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের গাফিলতি এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ অপরাধীদের মনে এক ধরণের অভয়ারণ্য তৈরি করে দিচ্ছে, যা সার্বিক পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও ভয়াবহ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।
এই চরম অবক্ষয় এবং শিশু ধর্ষণ ও হত্যার নেপথ্য কারণগুলো অনুসন্ধান করলে বেশ কিছু সামাজিক ও মানসিক মনস্তত্ত্বের অন্ধকার দিক উন্মোচিত হয়। বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও গবেষকদের তথ্য এবং সার্বিক সামাজিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই পৈশাচিক অপরাধগুলোর পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে মরণনেশা মাদক। ইয়াবা, হেরোইন, আফিম ও ফেনসিডিলসহ নানা ধরণের প্রাণঘাতী মাদকের অবাধ বিস্তার তরুণ ও যুবসমাজকে ভেতর থেকে একবারে অকেজো ও হিংস্র করে তুলছে।
মাদকাসক্ত ব্যক্তি তার স্বাভাবিক বিবেক, বুদ্ধি এবং মানবিক বোধ হারিয়ে এক পর্যায়ে চরম পাশবিক আচরণে লিপ্ত হয়, যার নির্মম শিকার হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল এবং অসহায় অংশ—আমাদের শিশুরা। যুবসমাজের এই আশঙ্কাজনকভাবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার পেছনে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে তীব্র বেকারত্ব সমস্যা। কর্মসংস্থানের অভাব তরুণদের হতাশাগ্রস্ত করে তুলছে এবং এই দীর্ঘমেয়াদী হতাশা থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই মাদকের অন্ধকার জগতে পা বাড়াচ্ছে, যা পরবর্তীতে কিশোর গ্যাং কালচার এবং বড় ধরণের অপরাধের দিকে তাদের ধাবিত করছে।
একই সাথে, পারিবারিক কাঠামোর শিথিলতা এবং অভিভাবকত্বের চরম ব্যর্থতা এই সংকটকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমান ব্যস্ত জীবনে অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছেন না বা দিতে পারছেন না। সন্তান প্রতিদিন কী করছে, কার সাথে মিশছে, তার বন্ধু সার্কেল কেমন, সে কোনো ভুল বা অপরাধমূলক সঙ্গের সাথে জড়িয়ে পড়ছে কি না, কিংবা কোনো কিশোর গ্যাং-এর সদস্য হয়ে উঠছে কি না—এই অপরিহার্য খোঁজখবরগুলো রাখার ব্যাপারে পরিবারের অভিভাবকদের মধ্যে এক ধরণের চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এই পারিবারিক নজরদারির অভাব এবং নৈতিক শিক্ষার অনুপস্থিতি কিশোর ও যুবসমাজকে খুব সহজেই অপরাধের চোরাবালিতে তলিয়ে দিচ্ছে। এই অন্ধকার বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসতে হলে কেবল আইনি কঠোরতাই যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রকে যেমন আইনের শাসন ও দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি পরিবারকে হতে হবে সন্তানের প্রথম ও প্রধান সুরক্ষাকবচ, যেখানে প্রতিটি অভিভাবক সচেতনভাবে তাদের সন্তানের গতিবিধির ওপর নজর রাখবেন এবং সমাজকে মাদকের নীল দংশন থেকে মুক্ত করতে সর্বাত্মক সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, এইতো গত১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ৭ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
এর আগে ১৬ মে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের চান্দের চর গ্রামের মদিনাপাড়ায় আছিয়া আক্তার (১০) নামে আরেক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করার ঘটনাটি দেশের বিবেককে আরও একবার বড় ধরণের ধাক্কা দিয়েছে। এর মাত্র দুদিন আগে, ১৪ মে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় ধর্ষণের পর লামিয়া আক্তার নামে চার বছরের এক অবুঝ শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, যার নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর স্থানীয় একটি ভুট্টাক্ষেত থেকে মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
তারও আগে, ৬ মে সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ এলাকায় চার বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারকে ধর্ষণচেষ্টার পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। একের পর এক ঘটে যাওয়া এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডগুলোতে আমাদের সকলের পাশাপাশি পুরো দেশবাসীর টনক নড়েছে এবং প্রতিটি নাগরিকের মনে আজ তীব্র ক্ষোভ ও গভীর শঙ্কার জন্ম দিয়েছে যে—দেশে আসলে কী হচ্ছে এসব? শিশু হত্যাকারী ও ধর্ষকদের বিরুদ্ধে আইনের সঠিক ও কঠোর প্রয়োগ অবিলম্বে নিশ্চিত করা না হলে, এই নরপশুরা আইনের নানা ফাঁকফোকর দিয়ে মাত্র কয়েক মাস পরেই কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে আসছে এবং সমাজকে তোয়াক্কা না করে আবারো একই ধরণের জঘন্য অপরাধে মেতে উঠছে।
এই ভয়াবহ বিচারহীনতার ধারা বন্ধ করতে সরকারের উচিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধের জন্য আরও কঠোর, দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুততম শাস্তির বিধান কার্যকর করা, যেন ভবিষ্যতে আর কোনো নিষ্পাপ শিশুকে এমন পৈশাচিক নির্যাতন, খুন ও গুমের শিকার হতে না হয় এবং প্রতিটি পরিবারের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরে আসে।