লামায় ১ নম্বরের নামে ৩ নম্বর ইট: খোদ ইউএনও’র নির্দেশ অমান্য করে ঠিকাদারের দাপট, নেপথ্যে পৌর ইঞ্জিনিয়ারের সিন্ডিকেট

স্টাফ রিপোর্টার:

বান্দরবানের লামা পৌরসভায় উন্নয়নের নামে সরকারি টাকা হরিলুটের এক নগ্ন ও বেপরোয়া মহোৎসব শুরু হয়েছে। সিডিউলের নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, খোদ উপজেলা ও পৌর প্রশাসনের নির্দেশকে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে, ঠিকাদার ও পৌর প্রকৌশলীর পারস্পরিক যোগসাজশে কলিংগাবিল এলাকায় চলছে এই লুটপাট। ১ নম্বর ইটের বাজেট গিলে খেয়ে চরম নিম্নমানের ২ ও ৩ নম্বর ইট দিয়ে ব্রিক সলিংয়ের কাজ চালিয়ে জনগণের ট্যাক্সের টাকা পকেটে ভরার নিখুঁত ছক এঁকেছেন তারা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, লামা পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের কলিংগাবিল মেইন রোড থেকে নাজমুল বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ২০০ ফুট ব্রিক সলিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে। কাগজে-কলমে এই প্রকল্পে সর্বোচ্চ মানের (১ নম্বর) ইট ব্যবহারের স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা ও সরকারি বাজেট বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে ঠিকাদার শিবলু বড়ুয়া চরম অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে পুরো রাস্তায় ভাঙাচোরা ২ ও ৩ নম্বর নিম্নমানের ইট বিছিয়ে সরকারি টাকা আত্মসাতের পাঁয়তারা করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা এই প্রকাশ্য দুর্নীতির হাতেনাতে প্রতিবাদ করলে অভিযুক্ত ঠিকাদার শিবলু বড়ুয়া তা অস্বীকার করেন। তবে সাধারণ মানুষ যখন তাকে ঘটনাস্থলে এসে ইট দেখে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ ছোড়েন, তখন তিনি দুর্নীতি ফাঁস হওয়ার ভয়ে সরেজমিনে আসতে পরিষ্কার অস্বীকৃতি জানান।

পরবর্তীতে দুর্নীতির এই ভয়াবহ চিত্র দেখে স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা সরাসরি লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও বর্তমান পৌর প্রশাসক মোঃ মঈন উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করেন। জনগণের অভিযোগের সত্যতা পেয়ে এবং নিম্নমানের ইটের কথা শুনে ইউএনও মহোদয় জনস্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ রাখার কঠোর নির্দেশ দেন।

প্রশাসনের এই আদেশের পর স্থানীয় জনগণ যখন কাজের সাইটে গিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক ও লোকদের কাজ বন্ধ করতে বলেন, তখন এক নজিরবিহীন ধৃষ্টতা দেখায় ঠিকাদারের লোকেরা। তারা সাইট থেকেই মোবাইল ফোনে মূল ঠিকাদার শিবলু বড়ুয়াকে বিষয়টি অবহিত করেন। কিন্তু খোদ উপজেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার নির্দেশ শোনার পরও ঠিকাদার শিবলু বড়ুয়া বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে, উল্টো কাজ বন্ধ না করে বীরদর্পে চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। নির্দেশ পেয়ে ঠিকাদারের লোকেরা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই রাস্তার কাজ চালিয়ে যায়।

প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করার এই চরম আস্পর্ধার পেছনে বেরিয়ে এসেছে এক থলের বিড়াল। অভিযোগ উঠেছে, এই মহাদুর্নীতির প্রধান দোসর ও সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন খোদ পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার (প্রকৌশলী)। স্থানীয়দের দাবি, পৌর ইঞ্জিনিয়ার সকালে সরেজমিনে এসে নিজের চোখে এই নিম্নমানের ৩ নম্বর ইট দেখার পরও কাজ বন্ধ না করে উল্টো তা চালিয়ে যাওয়ার সবুজ সংকেত দিয়ে যান। মূলত ইঞ্জিনিয়ারের প্রত্যক্ষ মদদ, দুর্নীতির অলিখিত লাইসেন্স ও ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেয়েই ঠিকাদার খোদ ইউএনও তথা পৌর প্রশাসকের নির্দেশ অমান্য করার সাহস পেয়েছেন।

এই টেকনিক্যাল দুর্নীতির বিষয়ে বক্তব্য জানতে পৌর ইঞ্জিনিয়ারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। দুর্নীতির ভাগবাটোয়ারা নিশ্চিত করতেই পৌর ইঞ্জিনিয়ারের এই রহস্যজনক নীরবতা এবং আত্মগোপন— যা প্রমাণ করে ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ারের যৌথ সিন্ডিকেটই এই সরকারি টাকা লুটের মূল কারিগর।

উন্নয়নের নামে পকেট ভারী করার এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রুখতে এবং খোদ প্রশাসনের আদেশ লঙ্ঘনকারী সিন্ডিকেটের মূল হোতা ঠিকাদার শিবলু বড়ুয়া ও তার প্রধান দোসর পৌর ইঞ্জিনিয়ারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তসহ দ্রুত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জেলা প্রশাসকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন কলিংগাবিল এলাকার ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *