মো. বেল্লাল হাওলাদার:
পটুয়াখালীর উপকূলীয় জনপদ মহিপুর ও কুয়াকাটাকে ঘিরে বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে, নতুন উপজেলা কোথায় হবে, মহিপুরে নাকি কুয়াকাটায়? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে দুই এলাকার মানুষের মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কখনো কখনো এমন এক ধরনের বিভাজনের চিত্র দেখা যাচ্ছে, যা আমাদের উপকূলীয় জনপদের মানুষের জন্য মোটেও কাম্য নয়। তবে এটাও সত্য যে, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগকে ঘিরেই আলোচনা-সমালোচনা থাকে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ যত বেশি আলোচনা হয়, তত বেশি বিষয়টি মানুষের নজরে আসে; আর প্রচারই কোনো দাবিকে জনমতের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে যেতে সহায়তা করে।
মহিপুরের সঙ্গে রয়েছে আমার ব্যক্তিগত আবেগ ও পারিবারিক ইতিহাসও। আমার বাড়ি মহিপুর ইউনিয়নে। মহিপুর বাজারের সঙ্গে আমার পরিবারের সম্পর্ক বহু প্রজন্মের। আমার দাদা ছিলেন এই বাজারের প্রতিষ্ঠাকালীন ব্যবসায়ীদের একজন, যিনি ‘কুটি মিয়া’ নামে সুপরিচিত ছিলেন। আমার চাচারা দীর্ঘদিন ধরে এখানে ব্যবসা করে আসছেন। আমিও একসময় মহিপুর বাজারের একজন ব্যবসায়ী ছিলাম। এখনও আমার চাচা ও চাচাতো ভাই এই বাজারের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তাই মহিপুর আমার কাছে কেবল একটি প্রশাসনিক এলাকা নয়; এটি আমার শৈশব, স্মৃতি, আবেগ, ভালোবাসা এবং অস্তিত্বের অংশ। তবে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আবেগের কারণেই আমি মহিপুর উপজেলা দাবির পক্ষে অবস্থান করছি না। আমার বিশ্বাস, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভৌগোলিক গুরুত্ব, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং জনসেবার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় মহিপুরের উপজেলা হওয়ার যথেষ্ট সক্ষমতা ও যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে।
একই সঙ্গে এটাও সত্য, কুয়াকাটার প্রতিও আমার গভীর ভালোবাসা রয়েছে। কুয়াকাটার সমুদ্র, প্রকৃতি ও মানুষকে নিয়ে আমি অসংখ্য কবিতা লিখেছি। এই সৈকতের সঙ্গে আমার হৃদয়ের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বাড়িতে গেলে সুযোগ করে আমি কুয়াকাটায় যাই। সমুদ্রের গর্জন, সূর্যাস্তের আলো আর অসীম জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকা আমার কাছে এক ধরনের আত্মিক প্রশান্তি।
তাই এই লেখাটি কুয়াকাটার বিপক্ষে নয়; বরং মহিপুর ও কুয়াকাটাকে একসঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতের উন্নয়ন ভাবনার একটি প্রচেষ্টা।
কুয়াকাটা আমাদের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘সাগরকন্যা’ নামে পরিচিত। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিদিন এখানে দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক আসেন। একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে কিছু কঠিন বাস্তবতাও। দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় ভাঙনের কারণে কুয়াকাটার আয়তন ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে। বহু মানুষের ঘরবাড়ি, জমিজমা ও জীবিকা সাগরের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আজও ভাঙনের সেই ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। ফলে কুয়াকাটার উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে উপকূল রক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ সড়ক উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোও এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। পাশাপাশি সৈকতের জিরো পয়েন্ট ও আশপাশের এলাকায় জোয়ারের পানিতে তলিয়ে থাকা কংক্রিটের কাঠামো পর্যটকদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যাপ্ত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকি এ ক্ষেত্রে জরুরি হয়ে উঠেছে।
কুয়াকাটা আমাদের গর্ব, আমাদেরই সম্পদ। তাই উপজেলার দাবির চেয়ে আগে প্রয়োজন কুয়াকাটার সৌন্দর্য, পরিবেশ ও অস্তিত্ব রক্ষা করা। কারণ কুয়াকাটা বাঁচলে পর্যটন বাঁচবে, অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এই অনন্য সম্পদ সংরক্ষিত থাকবে।
অন্যদিকে মহিপুর ইতোমধ্যে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণ ও বিপণন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিদিন এখানে বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণ, সংরক্ষণ ও বাণিজ্য পরিচালিত হয়। মৎস্যবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বরফকল, ব্যাংক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, খাদ্যগুদাম এবং বিস্তৃত ব্যবসায়িক অবকাঠামো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মহিপুরে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি কার্যকর ভিত্তি তৈরি হয়েছে। ভৌগোলিক দিক থেকেও এটি একটি কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে, যেখান থেকে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের কাছে প্রশাসনিক সেবা পৌঁছে দেওয়া তুলনামূলক সহজ।
মহিপুরকে উপজেলা ঘোষণার দাবি নতুন নয়। এটি দীর্ঘদিনের জনদাবি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সময়ে মহিপুর হাই স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনী জনসভায় সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন প্রকাশ্যে মহিপুরকে উপজেলা হিসেবে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সে সময় মহিপুর ও কুয়াকাটা এলাকার অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বর্তমানে যারা কুয়াকাটাকে উপজেলা করার পক্ষে মত দিচ্ছেন, তাদের অনেকেই তখন ওই জনসভায় উপস্থিত ছিলেন এবং ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদেও তিনি মহিপুরকে উপজেলা করার বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন। ফলে এটি কোনো হঠাৎ উত্থাপিত দাবি নয়; বরং দীর্ঘদিনের আলোচিত একটি বিষয়।
এই দাবির প্রতি জনসমর্থনের প্রতিফলনও বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে। মহিপুরবাসী দীর্ঘদিন ধরে এ দাবির পক্ষে সোচ্চার রয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে
গত ২ জুন ২০২৬ মহিপুর কো-অপারেটিভ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের হলরুমে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় চার ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, সুধীজন এবং সর্বস্তরের মানুষ মহিপুরকে দ্রুত উপজেলা ঘোষণার দাবি জানান। সভায় বক্তারা মহিপুরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব, মৎস্যবন্দরকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড, ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রশাসনিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে কুয়াকাটা একটি মূল্যবান পর্যটন এলাকা হওয়ায় সেখানে উপজেলা প্রশাসনের জন্য প্রয়োজনীয় বিস্তৃত সরকারি কার্যালয়, আবাসন, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মাঠ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই সে বিষয়টিও আলোচনায় আসে। অন্যদিকে মহিপুরে প্রশাসনিক সম্প্রসারণের তুলনামূলক বেশি সুযোগ রয়েছে বলে অনেকের অভিমত।
তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, উপজেলা গঠন শুধু আবেগ বা জনদাবির বিষয় নয়। ইউনিয়নের সংখ্যা, জনসংখ্যা, প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা, ভৌগোলিক বাস্তবতা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং সরকারি নীতিমালাসহ নানা বিষয় বিবেচনা করেই সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। এই বাস্তবতা আমাদের স্বীকার করতে হবে। তবে এটাও সত্য যে, বাস্তবতা ও সম্ভাবনার আলোকে নতুন উপজেলা গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলে ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক গুরুত্ব, পর্যটন শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা এবং বৃহত্তর জনসেবার প্রয়োজনীয়তার দিক থেকে মহিপুরের দাবিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক গুরুত্ব, পর্যটন শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা এবং বৃহত্তর জনসেবার প্রয়োজনীয়তার দিক থেকে মহিপুর একটি শক্তিশালী দাবিদার বলেই প্রতীয়মান হয়।
সম্প্রতি কুয়াকাটাকে উপজেলা করার পক্ষে মত প্রকাশ করায় মহিপুরের কৃতি সন্তান ও সিনিয়র সাংবাদিক বদরুল আলম নাবিলকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে সমালোচনা ও ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে, তা অনভিপ্রেত। ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক অংশ। আমি মনে করি উন্নয়নবিষয়ক আলোচনায় যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে হওয়া উচিত, ব্যক্তি আক্রমণ দিয়ে নয়।
আমার মতে, মহিপুর ও কুয়াকাটা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক। একটি অর্থনীতির শক্তি, অন্যটি পর্যটনের পরিচয়। একটি ছাড়া অন্যটির পূর্ণ বিকাশও সম্ভব নয়।
অতএব, কুয়াকাটা উপজেলা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় টানাটানি নয়; উপকূলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা উপকূলীয় জনপদের মানুষ হিসেবে প্রতিনিয়ত ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভাঙন ও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সংগ্রাম করে জীবনযাপন করছি। এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও আমরা উন্নয়ন ও সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখি। বাস্তবতা ও প্রয়োজনের নিরিখে যদি মহিপুরকে উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে তা প্রশাসনিক সেবার সহজপ্রাপ্যতা বৃদ্ধি, মৎস্যভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশ, স্থানীয় অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং বৃহত্তর উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের কাছে সেটিই হওয়া উচিত আমাদের সবার প্রত্যাশা।
আমি বিশ্বাস করি, মহিপুরকে উপজেলা হিসেবে বিবেচনা করার পক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী ও বাস্তবসম্মত যুক্তি রয়েছে। তাই এই দাবিকে আবেগ কিংবা বিরোধের দৃষ্টিতে নয়, বরং তথ্য, বাস্তবতা ও জনস্বার্থের আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত। দ্বন্দ্ব নয়, সমন্বয়ই হোক উপকূলীয় অগ্রগতির পথ।
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও সংগঠক