হাটহাজারী থানার ওসির বিরুদ্ধে ‘মামলা বাণিজ্যের’ অভিযোগ

এ এম এম আহসান:

চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে একটি রাজনৈতিক মিছিলকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য, বিতর্ক ও জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। মামলাটিকে কেন্দ্র করে হাটহাজারী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ‘মামলা বাণিজ্য’, রাজনৈতিক হয়রানি এবং প্রভাব বিস্তারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, গত ৪ জুন ২০২৬ তারিখে হাটহাজারী মডেল থানায় দায়ের হওয়া একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় ৬৯ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৩০ থেকে ৪০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। মামলার এজাহার অনুযায়ী, এর আগের দিন ৩ জুন ভোরে শিকারপুর ইউনিয়নের এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে অনুষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক মিছিলকে কেন্দ্র করেই মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের দাবি, মামলায় যেভাবে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে, বাস্তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকসংখ্যা তার ধারেকাছেও ছিল না। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই মিছিলে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ জন অংশগ্রহণ করেছিলেন। অথচ মামলায় ৬৯ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং আরও কয়েক ডজন ব্যক্তিকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে, যা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত ঘটনার তুলনায় অস্বাভাবিক সংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা, হয়রানি করা এবং আর্থিক সুবিধা আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা দাবি করেন, সম্প্রতি হাটহাজারী এলাকায় একই ধরনের একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে, যেখানে নাম অন্তর্ভুক্ত করা বা বাদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও স্থানীয়ভাবে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।

যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন তদন্ত বা আনুষ্ঠানিক প্রমাণ সামনে আসেনি, তবুও এলাকাজুড়ে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

মামলায় নাম আসা একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, ঘটনার দিন তারা কেউ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। অনেকেই নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ষড়যন্ত্রের শিকার বলে দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্য, প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও তাদের নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এদিকে মামলার বাদী মোঃ আরিফকে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। তাদের দাবি, অতীতেও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক অভিযোগ ও মামলার তথ্য রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে যে, ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল এবং প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে মামলাটিকে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছে হাটহাজারী মডেল থানার ভূমিকা। অভিযোগকারীদের দাবি, মামলাটি গ্রহণের আগে কোনো ধরনের প্রাথমিক অনুসন্ধান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন কিংবা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়নি। এমনকি মামলার এজাহারে উল্লেখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি কতটুকু শক্তিশালী, সেটিও যাচাই করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় কয়েকটি সূত্র আরও দাবি করেছে, থানাকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী চক্র ‘মামলা বাণিজ্য’ পরিচালনা করছে, যেখানে মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়া কিংবা গ্রেপ্তার এড়ানোর আশ্বাস দিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য হাটহাজারী মডেল থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী কোনো আমলযোগ্য অপরাধের অভিযোগ পেলে পুলিশ এজাহার গ্রহণ করতে বাধ্য। তবে একইসঙ্গে অভিযোগের প্রাথমিক বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহও পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে বড় পরিসরে একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হলে বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।

তাদের মতে, যথাযথ তদন্ত ছাড়া বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে মামলায় জড়ানো হলে নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হতে পারেন এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তবে মামলা দায়েরের শুরু থেকেই ওঠা নানা অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং ‘মামলা বাণিজ্য’ সংক্রান্ত আলোচনায় হাটহাজারীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, বিষয়টির সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। একইসঙ্গে তারা চান, প্রকৃত অপরাধীরা আইনের আওতায় আসুক এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার কারণে হয়রানির শিকার না হন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *