ডাক্তার নেই, রোগী দিশাহারা বরুড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র ফাঁস!

স্টাফ রিপোর্টার:

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ডাক্তার পাচ্ছেন না রোগীরা। চেম্বারে খোলা নেই কোন ডাক্তার, করিডোরে হতাশ মুখ। অথচ হাজিরা খাতায় ঠিকঠাক সই। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলছে এই নির্লজ্জ অনিয়মের মহোৎসব। সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে হাসপাতালটির ভেতরের ভয়াবহ চিত্র ডাক্তাররা সরকারি দায়িত্ব ফেলে রেখে ব্যস্ত প্রাইভেট ক্লিনিকে, আর অসহায় রোগীরা সেবার আশায় দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন।

সরেজমিনে যা দেখা গেল,

৯ জুন মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে এই প্রতিবেদক বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরেজমিন পরিদর্শনে যান। নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টায় অফিস শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, ডাক্তারদের চেম্বারগুলো ফাঁকা। কোনো চেম্বারে কোনো ডাক্তার নেই।

সহকারীদের জিজ্ঞেস করলে তারা জানায়, ডাক্তাররা উপরে মিটিংয়ে আছেন। এরপর উপরে গিয়ে বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজেদুর রহমানের কাছে মিটিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট জানান, কোনো মিটিং নেই।

হাজিরা খাতা দেখে তিনি জানান, সেদিন ১৬ জন চিকিৎসক উপস্থিত হয়েছেন। কিন্তু স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে নিচতলায় নেমে দেখা যায়, বেশিরভাগ ডাক্তারের চেম্বার শূন্য। পরে জানা যায়, তাঁদের অনেকেই কাছের বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখে সেরে হাসপাতালে উপস্থিত হচ্ছেন। ধরা পড়ার পর কেউ কেউ বলেন, “নিচে চা খেতে গিয়েছিলাম।”

রোগীদের অভিযোগ, নিত্যদিনের যন্ত্রণা,

ভুক্তভোগী রোগী ও তাঁদের স্বজনরা জানান, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রতিদিনই এই চিত্র। নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টায় অফিস শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অনেক ডাক্তার ১০টা, এমনকি ১১টায়ও আসেন। আবার দুপুর ১টা বাজলেই কর্মস্থল ছেড়ে চলে যান। ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীরা চিকিৎসা না পেয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বক্তব্য,

বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজেদুর রহমান এই প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেন, কয়েকজন ডাক্তারকে তাঁদের চেম্বারে পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, “আজকে আমাদের ১৭ জন ডাক্তারের মধ্যে ১৫ জন উপস্থিত ছিলেন। একজনের নাইট ডিউটি ছিল। তবে কেন কয়েকজনকে কক্ষে পাওয়া যায়নি, সেটা আমরা খতিয়ে দেখব। ইতোমধ্যে তাদের প্রশাসনিকভাবে শোকজ করা হয়েছে।”

এর আগে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানিয়েছিলেন, অনিয়মের অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের শোকজ করা হয়েছে এবং পরদিন তাঁরা জবাব দেবেন।

সিভিল সার্জনের আশ্বাস,

বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই অনিয়মের বিষয়টি কুমিল্লার সিভিল সার্জনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হলে তিনি বলেন, “আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমরা এ বিষয়ে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করব। সাংবাদিকরা হাসপাতালে গিয়ে পরিদর্শন করুন এটাকে আমরা সাধুবাদ জানাই এবং অত্যন্ত প্রশংসা করি।”

 

জনমনে প্রশ্ন জবাবদিহি কবে?

সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত অনুপস্থিতি, প্রাইভেট ক্লিনিকে সমান্তরাল চর্চা এবং রোগীদের সঙ্গে এই প্রতারণামূলক আচরণ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। শোকজ আর আশ্বাসের বৃত্তে ঘুরতে থাকা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান কবে হবে এই প্রশ্নই এখন বরুড়াবাসীর মুখে মুখে।

সচেতন মহল মনে করেন, শুধু শোকজ নয়, দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে এই অনিয়ম বন্ধ হবে না। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে তাঁরা দাবি জানান।

 

বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া,

মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক মো. দুলাল মিয়া তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “বরুড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এখন রোগীদের মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। রোগী আছেন, কিন্তু চিকিৎসক নেই। অযত্ন আর অবহেলায় এই হাসপাতালে অনেক মানুষ অকালে জীবন হারিয়েছেন। ডাক্তাররা নিয়মিত কর্মস্থলে থাকেন না সরকারি দায়িত্ব ফেলে রেখে নিজেদের স্বার্থে প্রাইভেট হাসপাতালে চেম্বার করেন। এই অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। সেবাগ্রহীতাদের মানবাধিকার রক্ষা করা দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়ছে  এই পরিস্থিতি আর মেনে নেওয়া যায় না।”

মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক আনজার শাহ বলেন, “বরুড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যা ঘটছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও দুঃখজনক। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা। দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরা সরকারি হাসপাতালে আসেন চিকিৎসা পাওয়ার ন্যূনতম অধিকার নিয়ে কিন্তু সেই অধিকারও আজ লুণ্ঠিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। অন্যথায় স্বাস্থ্যসেবার নামে এই প্রহসন চলতেই থাকবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *