বাবার গড়া লটকন বাগানে বদলে গেছে ভাগ্য, সচ্ছলতার মুখ দেখেছে মতিউরের পরিবার

মোঃ মশিউর রহমান:

একসময় সংসারের খরচ চালাতে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হতো মতিউর রহমানকে। কিন্তু শখের বশে পরিত্যক্ত জমিতে গড়ে তোলা একটি লটকন বাগান আজ তার পরিবারে ফিরিয়ে এনেছে স্বচ্ছলতা। মৃত্যুর পরও বাবার হাতে লাগানো লটকন গাছই এখন পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার আলোকদিয়া ইউনিয়নের লাউফুলা গ্রামের বাসিন্দা মতিউর রহমান প্রায় আট বছর আগে নিজের ৩৩ শতাংশ পরিত্যক্ত জমিতে শতাধিক লটকনের চারা রোপণ করেন। প্রায় তিন বছর পর গাছগুলোতে ফল আসতে শুরু করে। সেই বাগানের লটকন বিক্রি করে এখন স্বাবলম্বী হয়েছে তার পরিবার।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মতিউর রহমান জীবদ্দশায় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় (এনজিও) চাকরি করতেন। সীমিত আয়ের কারণে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো তাকে। তবে ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি গড়ে তোলেন লটকনের বাগান। প্রায় দুই বছর আগে তার মৃত্যু হলে পরিবারটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। কিন্তু বাবার লাগানো গাছের বাম্পার ফলন সেই সংকট কাটিয়ে নতুন আশার আলো দেখায়।

বর্তমানে বাগানটির দেখভাল করছেন তার বড় ছেলে, কলেজপড়ুয়া লাম আলিফ। তিনি জানান, এ বছরও বাগানে আশানুরূপ ফলন হয়েছে। প্রতিদিন পাকা লটকন বিক্রি করে ভালো আয় হচ্ছে। ফলে পরিবারে এখন আর অভাব-অনটন নেই। লটকন বিক্রির অর্থেই স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে চলছে তাদের জীবনযাপন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মধুপুর উপজেলা সদর থেকে কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে লাউফুলা গ্রামের ছায়াঘেরা বাগানটিতে থোকায় থোকায় ঝুলছে সোনালি রঙের লটকন। ফলভর্তি গাছগুলোর মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে।

মতিউরের ছোট ভাই আবুল হোসেন বলেন, “আমার ভাই যখন লটকনের চারা রোপণ করেছিলেন, তখন অনেকেই তাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু আজ সেই বাগানই তার পরিবারকে স্বাবলম্বী করেছে। ভাইয়ের স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে পরিবারটি এখন ভালোভাবে চলছে।”

তিনি আরও বলেন, বড় ছেলে লাম আলিফ মধুপুর কলেজে অনার্সে পড়াশোনা করছে এবং ছোট ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। ভাই মারা গেলেও পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী আয়ের উৎস রেখে গেছেন।

লাম আলিফ বলেন, “বাবা প্রায় আট বছর আগে এই বাগান গড়ে তুলেছিলেন। তিন বছর ধরে আমরা ফলন পাচ্ছি। বাবার মৃত্যুর পর বাগানে এলে তার কথা খুব মনে পড়ে। তিনি নেই, কিন্তু আমাদের জন্য যে আয়ের ব্যবস্থা করে গেছেন, তা অত্যন্ত লাভজনক। এই বাগান না থাকলে হয়তো আমাদের জীবন অনেক কষ্টের হতো।”

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, লটকন গাছ দোআঁশ ও লাল মাটিতে ভালো জন্মে। ছায়াযুক্ত পরিবেশ এ ফল চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। ফলে মধুপুর ও ঘাটাইলের পাহাড়ি ও উঁচু এলাকায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে লটকন চাষ।

টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খামারবাড়ির অতিরিক্ত উপপরিচালক রমজান আলী বলেন, জেলার লাল মাটির পাহাড়ি এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষ দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষ করে মধুপুর ও ঘাটাইল উপজেলায় এর ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। লটকন চাষ স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষি বিভাগ কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সঠিক পরিচর্যা ও বাজারজাতকরণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে লটকন চাষ ভবিষ্যতে আরও বেশি কৃষকের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ খুলে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *