মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষিত: বিআইডব্লিউটিএ-র বিতর্কিত সিন্ডিকেট রক্ষায় ‘ফাইল চাপা’র চেষ্টা!

এইচ এম হাকিম:

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কঠোর নির্দেশনা এবং পূর্বে সংঘটিত অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার নজির থাকার পরও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বহুল আলোচিত দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনে চরম উদাসীনতার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্তরা হলেন সংস্থাটির অতিরিক্ত পরিচালক মো. আব্দুস সালাম এবং তাঁর সহযোগী টাইপিস্ট মো. মাহে আলম। মন্ত্রণালয়ের আদেশের দুই সপ্তাহ পার হলেও এখনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। উল্টো অভিযোগকারী টানা ৫ দিন ঘুরে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তার দেখা পেলেও তাঁর কাছ থেকে মিলেছে অপেশাদার আচরণ। এই দুর্নীতিবাজ চক্রটিকে বাঁচাতে বিআইডব্লিউটিএ-র একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক উইং ফাইল চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে সংস্থাটির সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

তদন্তের দাবিতে গিয়ে ধমক ও কর্মকর্তার ‘অজুহাত’

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিআইডব্লিউটিএ-র এই প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের সুনির্দিষ্ট খতিয়ান তুলে ধরে মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন খোরশেদ আলম সীমান্ত নামের এক নাগরিক। গত ৭ জুন মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়ে বিআইডব্লিউটিএ-কে চিঠি পাঠানো হয়। এরপরই অভিযোগকারী হেড অফিসে পরিচালক (প্রশাসন) সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা শুরু করেন। টানা ৫ কর্মদিবস দপ্তরে ঘোরার পর অবশেষে ২৩ জুন পরিচালকের সাক্ষাৎ মেলে।

সাক্ষাৎকালে পরিচালক (প্রশাসন) দাবি করেন, অভিযুক্ত সালামের বিরুদ্ধে পূর্বের একটি তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এর আগেও অতিরিক্ত পরিচালক আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল; কিন্তু সেই কমিটি দায়সারাভাবে তদন্ত সম্পন্ন করে তাঁকে কোনো শাস্তি না দিয়ে প্রকারান্তরে বাঁচিয়ে দেয়।

নতুন এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে কেন কোনো নোটিশ বা চিঠি দেওয়া হয়নি—জানতে চাইলে পরিচালক (প্রশাসন) সদুত্তর দিতে পারেননি। একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি মন্তব্য করেন—

“দুই সপ্তাহ হয়েছে, সাত মাস তো হয়নি! আমাদের এখানে কাজের অনেক চাপ। মন্ত্রণালয়ের এই চিঠি আমার হাতে এসেছে দুই-তিন দিন হলো। আমি কমিটি গঠন করে আপনাকে জানাব।”

নেপথ্যে শক্তিশালী প্রশাসনিক সিন্ডিকেট

বিআইডব্লিউটিএ-র অন্দরমহলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের আদেশ বাস্তবায়নে এই অনীহা ও কালক্ষেপণের পেছনে রয়েছে এক গভীর নেপথ্য সমঝোতা। অতিরিক্ত পরিচালক আব্দুস সালাম ও টাইপিস্ট মাহে আলমের অবৈধ আয়ের সুবিধাভোগী হিসেবে প্রশাসনের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নাম জড়িয়েছে। ফলে এই চক্রটিকে আইনি প্রক্রিয়া থেকে আড়াল করতে পুরো প্রশাসনিক শাখা এখন একজোট হয়ে কাজ করছে। তদন্ত কমিটি গঠনে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করা এবং তথ্য না দিয়ে বাদীকে হয়রানি করা এই ধামাচাপা দেওয়ার কৌশলেরই অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মেগা ‘এনওসি’ বাণিজ্য ও কোটি টাকার সম্পদ

গত ৩০ এপ্রিল নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর জমা পড়া অভিযোগে এই সিন্ডিকেটের দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। সরকারের এলজিইডি, সওজ ও রেলওয়ের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্রিজের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) আটকে রেখে কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য করাই ছিল এই সালাম-মাহে আলম জুটির মূল কাজ। নদীর শ্রেণিবিন্যাস পরিবর্তন বা ব্রিজের উচ্চতার জটিলতার ভয় দেখিয়ে তারা দেশের মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দিনের পর দিন ঝুলিয়ে রাখতেন।

অভিযোগে আরও জানা যায়, গত ২০২৪–২৫ এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরে অতিরিক্ত পরিচালক আব্দুস সালাম সরকারের টিএ/ডিএ বাবদ লক্ষ লক্ষ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন। এই বিপুল অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট তথ্য চেয়ে ইতিমধ্যে তথ্য অধিকার আইনে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের বরাবর আবেদনও করা হয়েছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য মিলেছে টাইপিস্ট মাহে আলমের ক্ষেত্রে। মাত্র ৩৫ হাজার টাকা স্কেলের একজন সাধারণ কর্মচারী হয়েও তিনি ঢাকার অভিজাত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের খরচে বিমান ভ্রমণ এবং ফাইভ-স্টার হোটেলে বিলাসবহুল জীবনযাপন ছিল তাঁদের নিয়মিত রুটিন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কোনো কারিগরি জ্ঞানহীন এই টাইপিস্ট কীভাবে নীতিনির্ধারণী সভায় উপস্থিত থেকে ফাইলে প্রভাব খাটাতেন, তা নিয়ে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।

আইওয়াশ রুখতে চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপের দাবি

মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব ছন্দা পাল স্বাক্ষরিত অফিস আদেশ (স্মারক নম্বর: ১৮.০০.০০০০.০০০.০১৯.৯৯.০০২৫.২৫.১২৯) জারির পর সংস্থায় স্বস্তি ফিরলেও প্রশাসনের বর্তমান টালবাহানায় ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সাধারণ কর্মচারীরা চরম হতাশ। তাদের দাবি, অতীতের মতো এবারও যেন তদন্ত প্রক্রিয়াটি কোনো লোকদেখানো ‘আইওয়াশ’-এ পরিণত না হয়। ভেতরের সিন্ডিকেট যেভাবে আসামিদের আড়াল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তা রুখতে বিআইডব্লিউটিএ-র চেয়ারম্যানের অবিলম্বে সরাসরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়তে এই চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *