চট্টগ্রাম শহরে চলছে চাঁদাবাজদের রামরাজত্ব

কামরুল ইসলাম:

চট্টগ্রাম মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ফুটপাত ও অলিগলি দখলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে বিভিন্ন চক্র নগরীর ব্যস্ততম এলাকায় ফুটপাত, সড়কের একাংশ এবং আবাসিক গলিপথ দখল করে হকার, ভ্যানগাড়ি ও ভাসমান দোকান বসিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে নগরবাসীর স্বাভাবিক চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে যানজট। প্রশাসনের মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী না হওয়ায় দখলদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আগ্রাবাদ, জিইসি মোড়, জামালখান, আন্দরকিল্লা, নিউ মার্কেট, বহদ্দারহাট, চকবাজার, কোতোয়ালী, ইপিজেড, স্টেশন রোড, লালদিঘি, জিপিও মোড়, সিরাজউদ্দৌলা রোড, মুরাদপুর, বহদ্দারহাটসহ প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ফুটপাতের বড় অংশ দখল করে বসানো হয়েছে অস্থায়ী দোকান। কোথাও স্থায়ীভাবে টেবিল বসিয়ে ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে, আবার কোথাও শত শত ভ্যানগাড়ি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পুরো এলাকা ভাসমান বাজারে পরিণত হয়েছে। অনেক স্থানে ফুটপাত পুরোপুরি দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করছেন। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে।

বিশেষ করে নগরীর জিইসি মোড়ের সেন্ট্রাল প্লাজার পাশের ফুটপাত দীর্ঘদিন ধরে হকারদের দখলে রয়েছে। শুধু ফুটপাত নয়, সড়কের একটি অংশও টেবিল ও ভাসমান দোকানে ভরে গেছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সহজ করতে ও আর নিজাম রোডমুখী যান চলাচলের সুবিধার জন্য সিমেন্টের ব্লক দিয়ে যে সরু লেন তৈরি করা হয়েছিল, সম্প্রতি সেটিরও একাংশ দখল করে দোকান বসানো হয়েছে। ফলে একটি গাড়ি কোনোমতে চলাচল করতে পারলেও সামান্য যানবাহনের চাপ তৈরি হলেই পুরো এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

উইম্যান কলেজ মোড় থেকে গার্লস স্কুল পর্যন্ত সড়কেও একই চিত্র দেখা গেছে। কয়েক মাস ধরে রাস্তার দুই পাশে অসংখ্য ভ্যানগাড়ি স্থায়ীভাবে অবস্থান নেওয়ায় ব্যস্ত এই সড়কে যানবাহন চলাচল অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দা এই পথ ব্যবহার করলেও তাদের দুর্ভোগ কমছে না।

জামালখান এলাকায় বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রাস্তার ওপর কয়েকশ ভ্যানগাড়িতে বিভিন্ন ধরনের পোশাক, প্রসাধনী, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য সামগ্রী বিক্রি হয়। একইভাবে চকবাজারের চক সুপার মার্কেট থেকে ফুলতলা, কেয়ারি মোড় থেকে অলি খাঁ মসজিদ এবং তেলপট্টি থেকে চক সুপার মার্কেট পর্যন্ত প্রতিদিন শত শত অস্থায়ী দোকান বসে। এতে যানবাহন চলাচলের পাশাপাশি পথচারীদের চলাফেরাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের ফুটপাত, চট্টেশ্বরী মোড়, জয়নগর, দেওয়ান বাজার, চন্দনপুরা হয়ে আন্দরকিল্লা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে চলছে বেচাকেনা। জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে আসা রোগী, স্বজন ও অ্যাম্বুলেন্স চলাচলেও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

নিউ মার্কেট, স্টেশন রোড, লালদিঘি থেকে কোতোয়ালী মোড়, জিপিও থেকে নিউ মার্কেট মোড়, আন্দরকিল্লা এবং সিরাজউদ্দৌলা রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত টেবিল ও ভ্যানে ব্যবসা পরিচালিত হয়। এসব স্থানে পথচারীদের চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা প্রায় নেই বললেই চলে।

চান্দগাঁও থানাধীন বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারের সামনের ফুটপাত এবং পাশের আবাসিক সড়কও এখন ভাসমান দোকানের দখলে। শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, পোশাক, খেলনা, জুতা-মোজাসহ নানা ধরনের পণ্য বিক্রি হচ্ছে সেখানে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বাজারে আসা ক্রেতারাও চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিটি ভাসমান দোকান ও ভ্যানগাড়ি থেকে প্রতিদিন ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। ব্যবসার ধরন ও অবস্থানভেদে এই চাঁদার পরিমাণ আরও বেশি হয়ে থাকে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এসব এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত চাঁদা পরিশোধ না করলে কোনো ব্যবসায়ীকে ওই এলাকায় ব্যবসা করতে দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ভয়ভীতি ও নানা ধরনের হুমকিরও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীদের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক সম্প্রসারণ, ফুটপাত নির্মাণ ও সংস্কার করা হলেও অবৈধ দখলদারদের কারণে সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। যানজট নিরসনে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগও কার্যত ভেস্তে যাচ্ছে। প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াতকারী মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে। এতে সময়, জ্বালানি ও অর্থ—সবকিছুর অপচয় হচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ফুটপাত মূলত পথচারীদের জন্য নির্মিত হলেও অবৈধ দখল ও চাঁদাবাজির কারণে সেটি এখন বাণিজ্যিক ব্যবহারের স্থানে পরিণত হয়েছে। কার্যকর নজরদারি ও নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা না করলে এই সমস্যা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ফুটপাত ও সড়ক দখলের কারণে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে পুলিশকে প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হচ্ছে। তবে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করা মূলত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় হওয়ায় পুলিশের এককভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সীমিত।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরীর কোনো সড়ক বা ফুটপাত অবৈধ দখলে থাকতে দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, অবৈধ স্থাপনা অপসারণ এবং যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নগরবাসীর প্রত্যাশা, শুধু সাময়িক উচ্ছেদ অভিযান নয়, চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং ফুটপাত ও সড়ক স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। অন্যথায় কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও নগরবাসীর দুর্ভোগ কমবে না, বরং চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব আরও বিস্তার লাভ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *