মোঃ শামীম হোসেন সিকদার:
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদকে ঘিরে অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার ও কথিত নিয়োগ–টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন রুমা উপজেলা পরিষদের একজন অফিস সহকারী সনদ কান্তি দাস। সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী তাঁর কর্মস্থল রুমা উপজেলা পরিষদ হলেও বাস্তবে দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়কেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রুমা উপজেলা পরিষদের অফিস সহকারী হলেও সনদ কান্তি দাসের অধিকাংশ সময় কাটে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা মনসুর আলমের কার্যালয়ে। অভিযোগ রয়েছে, কর্মস্থলে নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করেও তিনি জেলা পরিষদের বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের অভ্যন্তরেও নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, জেলা পরিষদের উন্নয়ন প্রকল্প, বিভিন্ন বরাদ্দ, বাজেট বাস্তবায়ন, টেন্ডার কার্যক্রম এবং নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে সনদ কান্তি দাসের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। যদিও তিনি এসব বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা নন। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী কর্মকর্তা মনসুর আলমের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে আসছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মনসুর আলম যখন থানচি উপজেলার ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন, তখন থেকেই তাঁর সঙ্গে সনদ কান্তি দাসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সেই সম্পর্ক পরবর্তীতে আরও দৃঢ় হয় এবং বর্তমানে জেলা পরিষদেও তার প্রভাব অব্যাহত রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বান্দরবান বাজার ফান্ডের আওতাধীন বিভিন্ন প্লটের ক্রয়-বিক্রয়, শুনানি ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র প্রস্তুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে সনদ কান্তি দাস প্রভাব বিস্তার করেন। সংশ্লিষ্ট পক্ষের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত আবেদনকারী বা ক্রেতা-বিক্রেতা উপস্থিত না থাকলেও বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় এবং এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া জেলা পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বাজেট বণ্টন, ঠিকাদার নির্বাচন এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব কার্যক্রমে নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরকে কেন্দ্র করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং সেখানে সনদ কান্তি দাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও সনদ কান্তি দাস নিজেকে একজন ঠিকাদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (পাবলিক হেলথ)সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে তাঁর নামে বা তাঁর নিয়ন্ত্রণে কোটি কোটি টাকার উন্নয়নকাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে করতেই কীভাবে তিনি ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি চাকরিতে থেকে ঠিকাদারি কার্যক্রম পরিচালনা করা সরকারি আচরণবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে জেলা পরিষদের নিয়োগ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে। নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রের দাবি, বিভিন্ন শূন্যপদে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে চাকরিপ্রার্থী ও তাঁদের পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই কথিত নিয়োগ বাণিজ্যে সনদ কান্তি দাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং এর সঙ্গে আরও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একজন অফিস সহকারী কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে জেলা পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নানা সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেন, তা নিয়ে প্রশাসনের জবাবদিহি ও তদারকি ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারীর বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ থাকলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে বান্দরবানের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বলছেন, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের আয়-ব্যয়ের উৎস, সম্পদের হিসাব, সরকারি দায়িত্ব পালনের রেকর্ড এবং ঠিকাদারি কার্যক্রমের বৈধতা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে এ বিষয়ে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা মনসুর আলম এবং অফিস সহকারী সনদ কান্তি দাসের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।