এইচ এম হাকিম:
বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে জনমিতিক লভ্যাংশ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড)-এর পূর্ণ সুবিধা নিতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা খাত, খাতা-কলমে এবং মুখস্থ বিদ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে, যা উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী এবং পশ্চাৎপদ।
বিশ্বের বুকে চীন এবং জাপানের মতো শিল্পোন্নত দেশগুলো যেভাবে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে বিশ্বের অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে, সেই তুলনায় বাংলাদেশের চিত্রটি বিশ্লেষণ করলে এক চরম হতাশা এবং সীমাবদ্ধতার চিত্র ফুটে ওঠে, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা বিকাশের পথে অন্যতম বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। আমাদের দেশে প্রতি বছর শিক্ষা খাতের উন্নয়নে সরকারগুলো বিশাল অঙ্কের বাজেট ঘোষণা করে এবং পাস করে, যার মূল উদ্দেশ্য থাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ, মেধাবী ও স্বনির্ভর নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সেই বিশাল বাজেটের ব্যয়ের খতিয়ান এবং তার বিপরীতে অর্জিত বাস্তব ফলাফলের হিসাব মেলাতে গেলে দেখা যায়, কোনো সরকারই আজ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সফলতার মুখ দেখতে পায়নি। কারণ বাজেটের বড় অংশই অপচয় হয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রশাসনিক খাতে। অথচ শিক্ষার আসল প্রাণ, অর্থাৎ শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতার জায়গায় রয়ে গেছে এক বিশাল শূন্যতা।
আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে বটে, কিন্তু সেখানে হাতে-কলমে কাজ শেখার চেয়ে বইয়ের পাতা মুখস্থ করে পরীক্ষা পাস করার প্রবণতাই বেশি। আর এর সবচেয়ে বড় এবং রূঢ় কারণ হলো, যে নীতিনির্ধারক বা প্রশিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে-কলমে শিক্ষা দেবেন, তিনি নিজেই সেই বিষয়ের আধুনিক ব্যবহারিক প্রয়োগ সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন বা কোনো বাস্তব কারখানার কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর নেই। যার ফলে তিনি শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক জ্ঞান ছাড়া নতুন কিছু দিতে পারছেন না। এই সত্যটি যদি কেউ অস্বীকার করতে চান, তবে দেশের যেকোনো প্রান্তের কয়েকটি সাধারণ বা সরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে খোঁজ নিলেই ল্যাবরেটরিগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা এবং শিক্ষকদের দক্ষতার অভাব দেখে যে কারও দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা পলকেই পাল্টে যাবে।
চীন এবং জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, সেখানে একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই তাত্ত্বিক পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারিক কাজ, কারিগরি দক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং উৎপাদনমুখী শ্রমের সঙ্গে পরিচিত হয়। সেখানে জাপানের ‘মোনোজুকুরি’ দর্শন, অর্থাৎ কোনো কিছু নিখুঁতভাবে তৈরি করার শিল্পকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, চীনের ‘ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে প্রতিটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরাসরি স্থানীয় ভারী ও মাঝারি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, যাতে একজন শিক্ষার্থী ক্লাসরুম থেকে বের হয়েই সরাসরি কারখানায় গিয়ে কাজ শুরু করতে পারে। তাঁদের শিক্ষকরাও নিয়মিত বিরতিতে বিভিন্ন আধুনিক শিল্পকারখানায় গিয়ে নিজেরা কাজ করে নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে হালনাগাদ থাকেন। অথচ আমাদের দেশে একজন শিক্ষক একবার নিয়োগ পাওয়ার পর যুগের পর যুগ ধরে সেই পুরোনো আমলের সিলেবাস এবং অকেজো যন্ত্রপাতি দিয়েই শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন, যা বর্তমান যুগের চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বা অটোমেশনের এই আধুনিক সময়ে সম্পূর্ণ অচল এবং অপাংক্তেয়।
এই মারাত্মক সংকট থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে বাংলাদেশকে যদি বৈশ্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার সমকক্ষ করে তুলতে হয় এবং একটি স্বনির্ভর ও দক্ষ জাতিতে রূপান্তর করতে হয়, তবে শিক্ষা খাতে কেবল বাজেট বাড়ালেই হবে না; বরং সেই বাজেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। যার প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং যোগ্যতার মূল্যায়ন। যেখানে কারিগরি বিষয়ের শিক্ষকদের জন্য প্রতি বছর ন্যূনতম তিন থেকে ছয় মাস কোনো স্বনামধন্য শিল্পকারখানায় বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ বা বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন আইন করে বাধ্যতামূলক করা উচিত, যাতে তাঁরা নিজেরা আধুনিক প্রযুক্তি হাতে-কলমে শিখে এসে ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের তা নিখুঁতভাবে শেখাতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, দেশের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠানে, মান্ধাতা আমলের সিলেবাস সম্পূর্ণ বর্জন করে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা সায়েন্স, আধুনিক অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং উন্নত কৃষি প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলোকে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শুধু বইয়ের পাতায় এই বিষয়গুলো সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরিগুলোকে আধুনিক যন্ত্রপাতি দ্বারা সজ্জিত করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনের ক্লাসের অন্তত ৭০ শতাংশ সময় বাস্তব যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করার মাধ্যমে ব্যয় করবে।
তৃতীয়ত, সরকারি এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে একটি সুদৃঢ় অংশীদারিত্ব বা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ গড়ে তুলতে হবে, যার মাধ্যমে দেশের বড় বড় শিল্প গ্রুপগুলো সরাসরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তারা তাদের কারখানার প্রয়োজন অনুযায়ী কারিকুলাম তৈরিতে শিক্ষা বোর্ডকে সহায়তা করবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য পড়ালেখার চলাকালীন সময়েই পেইড ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা করবে, যাতে পড়াশোনা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের বেকার বসে থাকতে না হয় এবং তারা সরাসরি কর্মসংস্থানে প্রবেশ করতে পারে।
চতুর্থত, আমাদের প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতির খোলনলচে বদলে ফেলতে হবে। সনাতন পদ্ধতির মুখস্থনির্ভর লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে দিয়ে অন্তত ৮০ শতাংশ নম্বর বরাদ্দ রাখতে হবে শিক্ষার্থীর বাস্তব প্রজেক্ট তৈরি, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং ল্যাবরেটরি পারফরম্যান্সের ওপর। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার আগের রাতে বই মুখস্থ করার মানসিকতা থেকে বের হয়ে সারা বছর ধরে নতুন কিছু আবিষ্কার বা তৈরির পেছনে মেধা ও শ্রম ব্যয় করতে উদ্বুদ্ধ হবে।
পঞ্চমত, শিক্ষা প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ অত্যন্ত জরুরি। কারণ ঢাকা-কেন্দ্রিক নীতিনির্ধারণের ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত সমস্যা ও সম্ভাবনা সবসময় উপেক্ষিত থেকে যায়। তাই প্রতিটি অঞ্চলের স্থানীয় শিল্পের চাহিদা বিবেচনা করে, যেমন কোনো অঞ্চল যদি কৃষিপ্রধান হয়, তবে সেখানে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি এবং কোনো অঞ্চল যদি শিল্পপ্রধান হয়, তবে সেখানে মেকানিক্যাল বা টেক্সটাইল প্রযুক্তির ওপর জোর দিয়ে আঞ্চলিক শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করতে হবে।
ষষ্ঠত, শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা, বেতন কাঠামো এবং সুযোগ-সুবিধা উন্নত বিশ্বের মতো আকর্ষণীয় করতে হবে, যাতে দেশের সবচেয়ে মেধাবী তরুণ-তরুণীরা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি না খুঁজে শিক্ষকতা পেশাকে তাদের প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেয়। এর ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় মেধাবীদের আগমন ঘটবে, যারা নিজেদের মেধা দিয়ে পুরো জাতিকে বদলে দিতে সক্ষম হবেন।
সপ্তমত, সরকারি বাজেটের একটি বড় অংশ শুধু ভবন নির্মাণ বা ল্যাপটপ কেনার মতো খাতে ব্যয় না করে সরাসরি গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি)-এ বরাদ্দ দিতে হবে, যেখানে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা মিলে স্থানীয় সমস্যার প্রযুক্তিগত সমাধান আবিষ্কার করবেন। সেই আবিষ্কৃত প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়ার জন্য সরকার থেকে বিশেষ অনুদান বা স্টার্টআপ ফান্ডের ব্যবস্থা করা হবে, যা তরুণদের চাকরিপ্রার্থী হওয়ার বদলে চাকরিদাতা বা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
পরিশেষে বলা যায়, চীন ও জাপানের মতো বহিঃবিশ্বের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সমকক্ষ হতে হলে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে কাগজের সার্টিফিকেটের মোহ ত্যাগ করতে হবে। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে যে, একজন অদক্ষ জিপিএ-৫ পাওয়া গ্র্যাজুয়েটের চেয়ে একজন দক্ষ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন ডিপ্লোমাধারী তরুণ দেশের অর্থনীতির জন্য হাজার গুণ বেশি মূল্যবান। তাই নীতিনির্ধারকদের নিজেদের অজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠে বাস্তবমুখী ও দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাজাতে হবে। তবেই কেবল প্রতি বছর পাস হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রকৃত সদ্ব্যবহার হবে এবং বাংলাদেশ তার অদম্য যুবশক্তিকে কাজে লাগিয়ে পৃথিবীর বুকে একটি স্বনির্ভর, উন্নত এবং সমৃদ্ধশালী জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।