জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-তে নূর-এ-আলমের দাপুটে সিন্ডিকেটের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (কর্মসংস্থান) দপ্তরে কর্মরত একজন অফিস সহায়ককে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর অফিস সহায়ক শাহ মোহাম্মদ নূর-এ-আলমের দিকে। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রভাবশালী এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধভাবে বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, যার কারণে প্রতারণার শিকার হয়েছেন কয়েক হাজার চাকরিপ্রার্থী ও বিদেশগামী কর্মী।

অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন অভিযোগে জানা যায়, অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যোগসাজশ করে জাল ভিসা তৈরি, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে জনশক্তি পাঠানোর নামে সিন্ডিকেট বাণিজ্য, ম্যানপাওয়ার ক্লিয়ারেন্স, বিএমইটি কার্ড পাইয়ে দেওয়া, অবৈধ বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারসহ নানা ধরনের অনিয়মে এই সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দপ্তরের এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে যেখানে এই সিন্ডিকেটের প্রভাব ছাড়া কার্যক্রম এগোনো কঠিন হয়ে পড়ে।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ বা তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। কখনও প্রাণনাশের হুমকি, আবার কখনও মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।

বিএমইটিতে অফিস সহায়ক পদে কর্মরত থাকলেও শাহ মোহাম্মদ নূর-এ-আলম বর্তমানে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি চাকরির বেতনের সঙ্গে তার বর্তমান জীবনযাত্রা ও সম্পদের পরিমাণের কোনো সামঞ্জস্য নেই। তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ আর্থিক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে তিনি কোটিপতি হয়েছেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক মহাপরিচালক শহিদুল আলমের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে বিএমইটিতে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন নূর-এ-আলম। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি ধীরে ধীরে দপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ শুরু করেন। ফাইল চলাচল থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুমোদন, ক্লিয়ারেন্স এবং বদলির মতো বিষয়েও তার অঘোষিত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় বলে দাবি করেছেন একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

অভিযোগ অনুযায়ী, বর্তমান পরিচালক (বহির্গমন) তাজিম-উর-রহমানসহ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে তিনি নিজের প্রভাব আরও বিস্তৃত করেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যোগসাজশে জাল ভিসা তৈরি, বিদেশে কর্মী পাঠানোর নামে অর্থ আদায়, বিএমইটি কার্ড সংগ্রহে অনিয়ম, ম্যানপাওয়ার ক্লিয়ারেন্সে প্রভাব বিস্তার এবং টেন্ডার বাণিজ্য পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এখানেই থেমে থাকেননি নূর-এ-আলম। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মহাপরিচালকের আশীর্বাদে কর্মচারী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগপন্থী প্যানেল থেকে সাধারণ সম্পাদকের পদও লাভ করেন তিনি। এরপর রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, তারা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কোনো অভিযোগের কার্যকর তদন্ত হয়নি। তাদের অভিযোগ, অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর তা হয়তো প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় পড়ে থাকে অথবা তদন্তই শুরু হয় না। ফলে অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।

একজন ভুক্তভোগী বলেন, “আমরা বহুবার লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু কোনো তদন্ত হয়নি। আমাদের ধারণা, প্রভাবশালী একটি চক্র অভিযোগগুলো ধামাচাপা দেয়। অন্যথায় এত গুরুতর অভিযোগেরও তদন্ত না হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ বলেন, “আমার কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

অভিযোগের বিষয়ে শাহ মোহাম্মদ নূর-এ-আলমের বক্তব্য নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত মহাপরিচালক (কর্মসংস্থান) দপ্তরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

বিএমইটির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে এমন অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *