ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে চাপে রাশিয়ার অর্থনীতি, নগদ লেনদেন ও কর ফাঁকির প্রবণতা বাড়ছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়ার অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; দেশের আর্থিক ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন লেনদেনেও এর গভীর ছাপ পড়েছে। মোবাইল ইন্টারনেট সেবায় বারবার বিঘ্ন, কার্ডভিত্তিক লেনদেনে জটিলতা এবং করের বাড়তি চাপের কারণে রাশিয়ায় আবারও নগদ অর্থ ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। একই সঙ্গে করের বোঝা এড়াতে কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নানা কৌশল অবলম্বন করছে।

রোববার (১৯ জুলাই) প্রকাশিত বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে দেশটিতে ১ দশমিক ৫৬ ট্রিলিয়ন রুবল (প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) সমমূল্যের নতুন মুদ্রা ছাপানো হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় বাদ দিলে, বছরের একই সময়ে এত বেশি পরিমাণ মুদ্রা ছাপানোর নজির সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর দেখা যায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলার জেরে নিরাপত্তার স্বার্থে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বারবার মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে অনেক জায়গায় ব্যাংক কার্ডের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকার বলছে, ড্রোন হামলা প্রতিরোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই ইন্টারনেট সংযোগ সাময়িকভাবে সীমিত করা হচ্ছে।

মস্কোর এক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হাতে নগদ অর্থ থাকলে এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ কাজ করে। কারণ জরুরি পরিস্থিতিতে মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা অচল হয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা সম্ভব হয়।

রাশিয়ায় অনিশ্চয়তার সময়ে নগদ অর্থ জমিয়ে রাখার প্রবণতা নতুন নয়। এর আগে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আংশিক সেনা সমাবেশের ঘোষণা দেওয়ার পর এবং ২০২৩ সালের জুনে ওয়াগনার ভাড়াটে বাহিনীর বিদ্রোহের সময়ও বাজারে নগদ অর্থের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।

এদিকে যুদ্ধের ব্যয়ভার সামাল দিতে গিয়ে রাশিয়া ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতির মুখে পড়েছে। বাড়তি রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যে সরকার চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভ্যাট ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২২ শতাংশ করেছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ভ্যাট প্রদানের সীমাও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে আগে থেকেই আর্থিক চাপে থাকা বহু প্রতিষ্ঠান আরও সংকটে পড়েছে এবং কিছু প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় গত মে মাসে ২০২৬ সালের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ০ দশমিক ৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। ২০২২ সালের পর এটিই দেশটির সবচেয়ে নিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস।

দেশটির বৃহত্তম ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান স্বেরব্যাংকের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা তারাস স্কভোরতসভ জানান, করের চাপ এড়াতে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন কর্মীদের বেতন গোপনে নগদ অর্থে, অর্থাৎ ‘খামে করে’ পরিশোধ করছে। তার ভাষায়, এটি অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি সংকেত।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইন্টারফ্যাক্সের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, নগদ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসছে না; বরং মানুষের হাতেই থেকে যাচ্ছে। ফলে ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।

অন্যদিকে, রাশিয়ার বৃহত্তম ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা সংগঠন ওপোরা রাশিয়া পরিচালিত মে মাসের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৬ শতাংশ উদ্যোক্তা স্বীকার করেছেন যে, নতুন করের চাপ সামাল দিতে তারা বিভিন্ন ধরনের আর্থিক কৌশল বা অনানুষ্ঠানিক নগদ লেনদেনের আশ্রয় নিচ্ছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। ডিজিটাল লেনদেন ব্যাহত হওয়া, নগদ অর্থের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকির প্রবণতা—এসবই দেশটির অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *