নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্পিনিং, তাঁতসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পে গভীর প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। উৎপাদন কমে যাওয়া, রপ্তানি কার্যক্রমে বিঘ্ন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার অনিশ্চয়তা নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে শিল্পখাত সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে দেশের অনেক নিট পোশাক কারখানা এখন তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কাজে লাগাতে পারছে। বিশেষ করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি সংকটাপন্ন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে অনেক কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
তিনি জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কারখানাগুলোকে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল এয়ার শিপমেন্টের প্রয়োজন হচ্ছে, যা উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখে ফেলছে। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম সোলায়মান বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে দেশের প্রায় ১৫০টি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি মাধবদী, নরসিংদী, শেখেরচর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও টাঙ্গাইলের অধিকাংশ তাঁত কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং আমদানিকৃত সুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে দেশীয় স্পিনিং শিল্প এমনিতেই কঠিন সময় পার করছে। এর মধ্যে ১ শতাংশ টার্নওভার ট্যাক্স শিল্প উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। তাই দ্রুত জ্বালানি সংকট নিরসনের পাশাপাশি টার্নওভার ট্যাক্স পুনর্বিবেচনার দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ আটা-ময়দা মিল মালিক সমিতির সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক মোহাম্মদ সোহাগ বলেন, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পুরোপুরি নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের ওপর। দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট শুধু উৎপাদন নয়, বিনিয়োগ পরিবেশকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তিনি বলেন, সরকার দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে কাজ করছে। তবে দ্রুত ও কার্যকরভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধান করা না গেলে শিল্প ও বিনিয়োগ খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এ সংকট মোকাবিলায় সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ী সমাজ সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, দেশের রপ্তানি আয়, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে সচল রাখতে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি শিল্পখাতকে টিকিয়ে রাখতে কর-সুবিধা, আর্থিক প্রণোদনা এবং বাস্তবসম্মত নীতিগত সহায়তা দেওয়ারও আহ্বান জানান তারা।