টাঙ্গাইলে ভাইরাসে পচছে আখ, দিশেহারা কৃষক

মো. ফারুক আহমেদ:

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি মৌসুমে টাঙ্গাইলে আখের ভালো ফলনের আশা করেছিলেন কৃষকেরা। কিন্তু ফসল পরিপক্ব হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে অজ্ঞাত ভাইরাসজনিত রোগের আক্রমণে সেই আশা এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেতের পর ক্ষেত আখের কাণ্ড পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আক্রান্ত আখের অনেকগুলোই শুকিয়ে যাচ্ছে। আবার যেগুলো টিকে আছে, সেগুলোও আশানুরূপ মোটা হচ্ছে না। এতে উৎপাদন খরচ তো উঠছেই না, উল্টো বড় অঙ্কের লোকসানের আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৪৬৫ হেক্টর জমিতে আখের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি এলাকায় আখে ভাইরাসজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ‘ঈশ্বরদী’ জাতের আখ বেশি আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।

সরেজমিনে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, একসময় সবুজে ভরা আখের ক্ষেত এখন অনেকটাই বিবর্ণ। কোথাও কোথাও আখের কাণ্ড পচে মাটিতে পড়ে আছে। কোনো কোনো জমিতে হাতে গোনা কয়েকটি সুস্থ আখ দেখা গেলেও অধিকাংশ গাছই রোগাক্রান্ত। বছরের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস আখের এমন পরিস্থিতিতে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে কৃষক পরিবারের।

কৃষকেরা জানান, মৌসুমের শুরুতে আখের বৃদ্ধি ভালো ছিল। ফলে এবার ফলনও ভালো হবে বলে আশা করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে হঠাৎ করে আখে পচন শুরু হয়। ধীরে ধীরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। অনেক জমিতে এখন একটি আখও সুস্থ নেই।

বাজারেও আখের ন্যায্য দাম মিলছে না বলে অভিযোগ কৃষকদের। তাঁদের ভাষ্য, গত বছর প্রতিটি আখ ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হলেও এবার সর্বোচ্চ ২০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয়মূল্য কম হওয়ায় প্রতিটি আখে প্রায় ৩০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের সন্তান ও সাংবাদিক সুলতান কবির বলেন, ‘শুরু থেকেই আখের বৃদ্ধি ভালো ছিল। আমরা ভালো ফলনের আশা করেছিলাম। কিন্তু রোগ দেখা দেওয়ার পর একের পর এক আখ পচতে শুরু করে। সময়মতো রোগ দমনে কার্যকর ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় কীটনাশক না পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিষয়টি কৃষি বিভাগকে জানানো হলেও মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।’

সদর উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, ‘এবার ফলন খুব ভালো হবে—এই আশায় আখ চাষ করেছিলাম। কিন্তু ভাইরাসে পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। আখ বিক্রি করে সংসার চালানোর স্বপ্ন ছিল। চাষের জন্য অনেকের কাছ থেকে ধারদেনাও করেছি। এখন সেই ঋণ কীভাবে পরিশোধ করব, সেটাই চিন্তার বিষয়।’

তিনি বলেন, ‘ঈশ্বরদী জাতের আখ সবচেয়ে বেশি নষ্ট হয়েছে। আমরা কৃষি বিভাগকে বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে না দাঁড়ালে আমরা বড় ধরনের সংকটে পড়ে যাব।’

সদর উপজেলার খারজানা গ্রামের কৃষক আবু হানিফ ১০ শতাংশ জমিতে আখ চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এবার আখ চাষে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফলন ভালো থাকলে এবং আখ মোটা হলে হয়তো খরচের টাকা উঠে আসত। কিন্তু ভাইরাসে সব শেষ হয়ে গেছে। এখন যা আছে, সেগুলো বিক্রি করে হয়তো ১০ হাজার টাকার মতো পাওয়া যেতে পারে। এর সঙ্গে বিক্রির খরচও আছে।’

পাকুল্ল্যা এলাকার কৃষক দবির উদ্দিন বলেন, গত বছর ৩৩ শতাংশ জমিতে আখ চাষে তাঁর খরচ হয়েছিল প্রায় ৫০ হাজার টাকা। ওই জমি থেকে প্রায় ২ হাজার ৪০০ পিস আখ পাওয়া যায় এবং সেগুলো বিক্রি করে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা আয় হয়েছিল। কিন্তু এবার একই জমিতে ভাইরাসের আক্রমণে আখের সংখ্যা কমে প্রায় ১ হাজার ২০০ পিসে দাঁড়িয়েছে। ফলে এবার উৎপাদন ও আয়—দুটোই ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।

কৃষকদের অভিযোগ, রোগ দেখা দেওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব হতো। এখন তাঁরা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারের জরুরি সহায়তা চান। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে অনুদান বা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি দ্রুত রোগের কারণ শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক শোয়েব মাহমুদ বলেন, ‘কিছু এলাকায় আখে ভাইরাসজনিত সমস্যার তথ্য আমরা পেয়েছি। বিষয়টি মাঠপর্যায়ে তদন্ত করে দেখছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, আক্রান্তের মাত্রা ও রোগের কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *