বিদ্যমান স্থান বাদ দিয়ে অন্যত্র ইউপি কমপ্লেক্স নির্মাণের অভিযোগ, হাইকোর্টের রুল

ফাতেমা খুরশিদ সোমায়া:

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের স্থান পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও জমিদাতাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসা বর্তমান স্থানের পরিবর্তে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বাঙ্গালীনগর মৌজায় নতুন স্থানে কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, সরকারি নীতিমালা ও একাধিক প্রশাসনিক সুপারিশ উপেক্ষা করে স্থান পরিবর্তনের এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। বিদ্যমান স্থানের পরিবর্তে অন্যত্র ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মাণ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রিটকারী পক্ষের আইনজীবী।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নথি অনুযায়ী, ১৯৬৪ সালের ২৮ মে উত্তর মির্জানগর মৌজার সাবেক ১৫৫৩ নম্বর দাগে ইয়াকুব আলী ১০ শতাংশ জমি ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণের জন্য দান করেন। পরে ওই জমিতে সরকার একতলা ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণ করে। দীর্ঘদিন ধরে সেখান থেকেই ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। ভবনটি বর্তমানে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় নতুন কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী বিদ্যমান ভবনের সংলগ্ন প্রায় শূন্য দশমিক ৫০ একর জমিও ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য দান করা হয়। ২০০৭ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম আলম সম্ভাব্য দুটি স্থান সরেজমিনে পরিদর্শন করে বিদ্যমান স্থানটিকে উপযুক্ত হিসেবে সুপারিশ করেন। উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ারও বিদ্যমান জমিকে নিষ্কণ্টক বলে প্রত্যয়ন করেন।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নথি থেকে জানা যায়, সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ জয়নুল বারী উভয় স্থান পরিদর্শন করে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বিদ্যমান স্থানটিকে অগ্রাধিকারযোগ্য বলে মতামত দেন। পরে ২০০৮ সালের ২৭ মার্চ তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান স্থানীয় সরকার বিভাগে বিদ্যমান স্থানেই কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের সুপারিশ করে প্রস্তাব পাঠান।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও জমিদাতাদের অভিযোগ, এসব প্রশাসনিক সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও বিদ্যমান স্থানের পরিবর্তে বাঙ্গালীনগর মৌজায় নতুন স্থানে ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রস্তাবিত স্থানটি সরকারি পরিপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অভিযোগে বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান মো. বশির উদ্দিন রিপনের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত স্বার্থে নিজের বাসার কাছাকাছি এলাকায় কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে গত ৩০ মে বিদ্যমান স্থানেই ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মাণের দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হামলার অভিযোগও করেছেন আয়োজকেরা। এ ঘটনায় ইউপি চেয়ারম্যান ও তাঁর লোকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হলেও এর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য জানা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

হাইকোর্টে রিটকারী ও জমিদাতা আজিজুল হক বলেন, “মির্জানগর ইউনিয়নের কেন্দ্রস্থলে বর্তমান পরিষদ ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে জনগণের সেবাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমার পরিবার ইউপি ভবনের জন্য জমি দিয়েছে। তাই বিদ্যমান স্থানেই নতুন ভবন নির্মাণ করা উচিত।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমান চেয়ারম্যান নিজের বাসায় ইউপি কার্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বিষয়টি আইনগতভাবে সঠিক কি না, সেটিও প্রশ্নের বিষয়। এ কারণে আমি গত ডিসেম্বরে হাইকোর্টে রিট করেছি।”

রিটকারীর আইনজীবী কে এম সামসাদ বলেন, “গত ২৭ জুলাই হাইকোর্ট এ বিষয়ে রুল জারি করেছেন। বিদ্যমান স্থানে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণ না করে অন্যত্র নির্মাণ করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।”

অভিযোগের বিষয়ে বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান মো. বশির উদ্দিন রিপনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যান ইউনিয়নের যেকোনো জায়গা থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন। আমি নিজের বাসায় করছি, এটা অপরাধ নয়।”

স্থানীয় বাসিন্দা ও জমিদাতাদের দাবি, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক নথি, জমিদাতাদের স্বার্থ এবং ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় অবস্থান বিবেচনা করে মির্জানগর ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের স্থান পরিবর্তন না করে বিদ্যমান স্থানেই নতুন ভবন নির্মাণ করা হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *