স্টাফ রিপোর্টার:
ঢাকার ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) কার্যক্রমের ডি-৯ এলাকায় চাল ও আটা বিক্রিতে অনিয়ম, কালোবাজারি এবং তদারককারীদের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে একই এলাকায় দায়িত্ব পালন করা ওএমএসের তদারককারী জাহাঙ্গীর হোসেনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, ডি-৯ এলাকার ওএমএস কার্যক্রমে দায়িত্বপ্রাপ্ত তদারককারী জাহাঙ্গীর হোসেন দীর্ঘদিন ধরে একই এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন একই এলাকায় দায়িত্বে থাকার কারণে ডিলার ও বিক্রেতাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। নিয়মিতভাবে ট্রাক ও বিক্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করার কথা থাকলেও বাস্তবে তাকে অনেক সময় ঘটনাস্থলে পাওয়া যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ডিলারদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে বিক্রয় কার্যক্রমে অনিয়ম দেখেও তা উপেক্ষা করা হয়। এর ফলে সরকারি ভর্তুকিমূল্যের চাল ও আটা প্রকৃত ভোক্তাদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ডিলারশিপ পরিচালনায় ‘ভাড়াটিয়া বিক্রেতা’র অভিযোগ
ডি-৯ এলাকার কয়েকজন ডিলারের কার্যক্রম নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ডিলারশিপের মূল মালিকদের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে ওএমএসের পণ্য বিক্রির কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডিলারশিপ ‘ভাড়া’ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এ বিষয়ে মুসা নামে এক বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, তিনি তিনটি ডিলারের হয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ডিলাররা হলেন—মো. সোরাব, আবেদা ও মাহফুজা।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি ওএমএস কার্যক্রমে নির্ধারিত মূল্যে চাল ও আটা বিক্রি করে যেখানে লাভের পরিমাণ সীমিত, সেখানে একাধিক ডিলারশিপ অন্যের মাধ্যমে পরিচালনা করে কীভাবে অতিরিক্ত মুনাফা করা হচ্ছে।
চাল-আটা কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, ডি-৯ এলাকার কিছু ওএমএস ডিলার ও বিক্রেতা তদারককারীদের ‘ম্যানেজ’ করে বরাদ্দকৃত চাল ও আটার একটি অংশ খোলাবাজারে বেশি দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে সরকার নির্ধারিত মূল্যে সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ করা খাদ্যপণ্য প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বিক্রেতা মুসা বলেন, তিনি যে কার্যক্রম পরিচালনা করেন তা নিয়ম মেনেই করেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো অনিয়মের কথা স্বীকার করেননি।
ঘটনাস্থলে না থাকার অভিযোগ, ফোনে তদারককারীর বক্তব্য
সম্প্রতি ডি-৯ এলাকার একটি বিক্রয়কেন্দ্রে মো. সোরাবের ট্রাকে ওএমএসের পণ্য বিক্রির সময় বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে গেলে ঘটনাস্থলে তদারককারী জাহাঙ্গীর হোসেনকে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা।
পরে তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিক্রি কার্যক্রম চলার কথা জানান। একই সঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্ট বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তার মোবাইল নম্বর দেন বলে অভিযোগকারীরা জানান।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি খাদ্যপণ্য বিক্রির সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত তদারককারী ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলে বিক্রয় কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারকি হচ্ছে কীভাবে?
আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন
ওএমএস কার্যক্রমের একটি ট্রাকের বিক্রিতে ডিলারদের প্রকৃত লাভের পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের হিসাবে, একটি ট্রাক সেলে লাভের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। এর মধ্যে ট্রাক ভাড়া, কর্মচারীদের খরচসহ বিভিন্ন ব্যয় রয়েছে। এরপরও যদি অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়, তাহলে নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করে প্রকৃত লাভ কতটা থাকে—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে যদি অনিয়ম বা কালোবাজারি হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিক্রয় রেজিস্টার, বরাদ্দ, উত্তোলন, বিক্রয় ও অবশিষ্ট পণ্যের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।
জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
তদারককারী জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে ঘুষের মাধ্যমে বিপুল অর্থ ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগও করেছেন অভিযোগকারীরা। এমনকি ঢাকা ও বরিশালে তার নামে বিপুল সম্পদ রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এসব সম্পদের বিষয়ে কোনো সরকারি নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
অভিযোগকারীরা তার সম্পদের উৎস ও ওএমএসে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওএমএস কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত এবং ঢাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। সন্তানদের লেখাপড়ার বিষয়েও তিনি কথা বলেন। তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো অনিয়মের কথা স্বীকার করেননি। তিনি অভিযোগকারী পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
সাংবাদিক ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগও
ওএমএসের ডি-৮ ও ডি-৯ এলাকার অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগে জাকির নামে এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়গুলো সামাল দেন এবং এ কাজে অর্থ লেনদেন করেন বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।
তবে এ অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের বক্তব্যও এ প্রতিবেদনে পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন।
এআরও বললেন, বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে
অভিযোগের বিষয়ে এআরও আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বিষয়টি আমি যাচাই করে দেখছি।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওএমএস সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নির্ধারিত মূল্যে চাল ও আটা বিক্রির এ কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে কোনো ডিলার প্রকৃত মালিকের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির মাধ্যমে ডিলারশিপ পরিচালনা করছেন কি না, বরাদ্দকৃত পণ্য সম্পূর্ণ পরিমাণে বিক্রি হচ্ছে কি না, বিক্রয় রেজিস্টারের সঙ্গে বাস্তব বিক্রয়ের মিল রয়েছে কি না এবং তদারককারীরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি।
অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে জাহাঙ্গীর হোসেনসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, আয়-ব্যয়ের হিসাব, ডিলারশিপের কাগজপত্র, পণ্য উত্তোলন ও বিক্রয় রেজিস্টার এবং সম্পদের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।