লাল শাপলার মায়াবী রাজ্য সাতলা বিল, মুগ্ধ করছে প্রকৃতিপ্রেমীদের

জেলা প্রতিনিধি ::

ভোরের কোমল আলোয় বিস্তীর্ণ জলরাশিজুড়ে ফুটে আছে অসংখ্য লাল শাপলা। দূর থেকে মনে হয়, পানির বুকে যেন বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে লাল ফুলের চাদর। কোথাও ছোট নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে, কোথাও ডানা মেলছে সাদা বক কিংবা পানকৌড়ি। পানির কলকল শব্দ, পাখির কলকাকলি আর নির্মল গ্রামীণ পরিবেশ মিলিয়ে সাতলার শাপলা বিল হয়ে উঠেছে প্রকৃতির এক অনন্য সৌন্দর্যের আধার।

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার উত্তর সাতলা গ্রামের বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে বর্ষা মৌসুমে দেখা মেলে এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের। বরিশাল শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের এই বিল বর্ষার পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর ফুটতে শুরু করে লাল শাপলা। সাধারণত জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিলের বিস্তীর্ণ জলরাশি রাঙিয়ে রাখে এসব ফুল।

স্থানীয়দের কাছে এটি সাতলা বিল নামে পরিচিত হলেও লাল শাপলার আধিক্যের কারণে দেশজুড়ে ‘সাতলার লাল শাপলার বিল’ হিসেবেই বেশি পরিচিত। শাপলা ফোটার মৌসুমে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে আসেন এখানে। বিশেষ করে ভোরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকদের ভিড় বাড়ে।

বিলের পানির ওপর সারি সারি লাল শাপলা সূর্যের আলোয় আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ফুলের ফাঁক দিয়ে নৌকা চলার দৃশ্য পুরো পরিবেশে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। বিলের মাঝখানে থাকা বাড়িঘরের মানুষের চলাচলেরও অন্যতম প্রধান মাধ্যম নৌকা। পর্যটকরাও ছোট নৌকায় চড়ে বিলের ভেতর ঘুরে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।

স্থানীয়রা জানান, যুগ যুগ ধরে সাতলা বিলে শাপলা ফুটে আসছে। লাল শাপলার পাশাপাশি সাদা ও বেগুনি শাপলাও দেখা যায়। তবে সংখ্যায় লাল শাপলাই বেশি।

বরিশাল শহর থেকে ঘুরতে আসা সাকিল বলেন, ‘সাতলার শাপলা বিলের সৌন্দর্য সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। প্রকৃতির সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে এটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।’

বাবুগঞ্জ থেকে আসা নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমি প্রতিবছর এই শাপলার বিলে আসি। খুব সকালে এলে শাপলার সৌন্দর্য সবচেয়ে ভালোভাবে উপভোগ করা যায়। চারপাশে লাল শাপলা আর নৌকায় ভেসে থাকার অনুভূতি অন্যরকম। এখানে এলে মনে হয় প্রকৃতির খুব কাছাকাছি চলে এসেছি।’

শুধু শাপলাই নয়, সাতলা বিলের জীববৈচিত্র্যও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বিল ও এর আশপাশে সাদা বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, ফিঙে, শালিক, দোয়েল, চড়ুই ও কাঠঠোকরাসহ বিভিন্ন দেশীয় পাখির বিচরণ দেখা যায়। ফলে প্রকৃতিপ্রেমীদের পাশাপাশি পাখিপ্রেমীদের কাছেও জায়গাটি হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় গন্তব্য।

বাড়ছে পর্যটন সুবিধা

দীর্ঘদিন ধরে পর্যটকদের আকৃষ্ট করলেও পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবে সাতলার শাপলা বিলে নানা অসুবিধায় পড়তে হতো দর্শনার্থীদের। সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বিলটিকে আরও আধুনিক, আকর্ষণীয় ও পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শাপলা বিলের প্রবেশমুখে নির্মাণ করা হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন গেট। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য ভিউ পয়েন্ট, ঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। এসব উন্নয়নকাজ শেষ হলে পর্যটকরা আরও নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

সাতলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে শাপলা বিলের সৌন্দর্য প্রচারের পাশাপাশি পর্যটন বিকাশে স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সম্ভাবনা রয়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে

সাতলার শাপলা বিল শুধু উজিরপুরের নয়, বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পর্যটনসম্পদ। শাপলা ফোটার মৌসুমে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটক আসায় স্থানীয়ভাবে নৌকা, পরিবহন, খাবারসহ বিভিন্ন সেবাকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড বাড়ে।

পর্যটন অবকাঠামো আরও উন্নত হলে স্থানীয় তরুণদের জন্য নৌকা পরিচালনা, খাবারের দোকান, পর্যটনসেবা ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি অর্থনীতিও আরও গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে পর্যটন উন্নয়নের পাশাপাশি বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন সচেতন মহল। অতিরিক্ত স্থাপনা কিংবা পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডে যাতে শাপলা ও জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সড়ক বা নৌপথে প্রথমে বরিশাল যেতে হবে। এরপর সড়কপথে উজিরপুর উপজেলার ইচলাদী বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে সেখান থেকে ইজিবাইক বা মাহিন্দ্রায় উত্তর সাতলার শাপলা বিলে পৌঁছানো যায়।

ঢাকা থেকে নৌপথে বরিশাল এসেও সড়কপথে উজিরপুরের সাতলায় যাওয়া সম্ভব। শাপলা গ্রামের আশপাশে স্থানীয় খাবারের হোটেল রয়েছে। তবে রাতযাপনের জন্য পর্যটকদের উজিরপুর সদর কিংবা বরিশাল শহরের আবাসিক হোটেলে থাকতে হয়।

উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা বলেন, ‘সাতলার শাপলা বিল উজিরপুরের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক সম্পদ ও পর্যটন সম্ভাবনার জায়গা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রবেশদ্বার, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজের মাধ্যমে স্থানটিকে আরও আকর্ষণীয় ও পর্যটকবান্ধব করে তোলার চেষ্টা চলছে।’

তিনি আরও বলেন, সাতলার শাপলা বিলের সৌন্দর্য দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে পর্যটন সুবিধা বাড়ানো গেলে এটি শুধু উজিরপুর নয়, বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সুযোগও তৈরি হবে।

প্রকৃতির অপরূপ লাল শাপলা, বিস্তীর্ণ জলরাশি, নৌভ্রমণ, পাখির কলকাকলি আর গ্রামীণ পরিবেশ—সব মিলিয়ে সাতলার শাপলা বিল এখন দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র। তাই প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটাতে চাইলে শাপলা ফোটার মৌসুমে ঘুরে আসতে পারেন বরিশালের এই লাল শাপলার রাজ্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *