মোঃআনজার শাহ :
কেউ কেউ চলে যান, কিন্তু তাঁদের কর্ম মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায় বহু প্রজন্ম ধরে। কুমিল্লার বরুড়ার মাটি ও মানুষের কাছে মরহুম এ কে এম আবু তাহের তেমনই এক স্মরণীয় নাম। শিল্পপতি, ব্যাংকার, রাজনীতিক, সমাজসেবক ও জনহিতৈষী বহুমাত্রিক পরিচয়ে তিনি যেমন জাতীয় পরিসরে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছিলেন, তেমনি জনপ্রতিনিধি হিসেবে বরুড়ার যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে রেখে গেছেন গভীর স্মারক।
স্থানীয় মানুষের কাছে এ কে এম আবু তাহের কেবল সাবেক সংসদ সদস্য নন; তাঁকে আধুনিক বরুড়ার উন্নয়নচিন্তার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবেও স্মরণ করা হয়। তাঁর কর্মজীবন ছিল ব্যবসায়িক সাফল্য, জনকল্যাণ, রাজনীতি ও এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের এক সমন্বিত অধ্যায়।
সোনাইমুড়ী থেকে জাতীয় অঙ্গন:
বরুড়া উপজেলার আদ্রা ইউনিয়নের সোনাইমুড়ী গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এ কে এম আবু তাহের গ্রাম থেকে উঠে এসে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল পয়েলগাছা উচ্চ বিদ্যালয়।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, কর্মঠ ও দূরদর্শী। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে একটি এলাকার টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়; শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তার সম্মিলিত উন্নয়নই পারে একটি জনপদের ভাগ্য বদলে দিতে।
পরবর্তী সময়ে তাঁর ব্যবসা, ব্যাংকিং, সমাজসেবা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এ দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায় বলে এলাকাবাসীর দাবি।
ব্যাংকিং ও শিল্প খাতের অগ্রপথিক:
বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের বিকাশের শুরুর সময়ের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন এ কে এম আবু তাহের। তিনি ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, স্পন্সর পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন সমসাময়িক ও পরবর্তী সংবাদসূত্রে তাঁকে ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি শিল্প ও বীমা খাতেও তাঁর সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছিল। বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্র অনুযায়ী, তিনি আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং প্রগতি ইন্স্যুরেন্স ও প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি দেশের ব্যবসায়িক অঙ্গনেও সুপরিচিত হয়ে ওঠেন।
তবে ব্যবসায়িক সাফল্যের মধ্যেও মানুষের সঙ্গে তাঁর সংযোগ ছিল গভীর। স্থানীয়দের স্মৃতিচারণে উঠে আসে, তিনি ব্যক্তিগত সাফল্যকে শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন।
তিনবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য:
এ কে এম আবু তাহের বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে কুমিল্লা-৭-বর্তমান কুমিল্লা-৮, বরুড়া-আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী হয়েছিলেন।
সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর পরিচয়ের অন্যতম দিক ছিল বরুড়াকেন্দ্রিক উন্নয়নচিন্তা। স্থানীয়দের ভাষ্য, এলাকার সড়ক যোগাযোগ, ব্রিজ-কালভার্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
একসময় বরুড়ার বহু গ্রামীণ পথ বর্ষা মৌসুমে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ত। কাঁচা রাস্তা, অপর্যাপ্ত সেতু ও কালভার্ট, কৃষিপণ্য পরিবহনে দুর্ভোগ এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতের বাধা ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। এ পরিস্থিতিতে সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামোকে তিনি উন্নয়নের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে দেখেছিলেন বলে এলাকাবাসী জানান।
শিক্ষার বিস্তারে অঙ্গীকার:
এ কে এম আবু তাহের বিশ্বাস করতেন, উন্নয়নের স্থায়ী ভিত্তি হলো শিক্ষা। তাঁর উদ্যোগে বা সহযোগিতায় বরুড়ার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান উপকৃত হয়েছে এমন স্মৃতিচারণ স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, ভবন নির্মাণ ও সংস্কার, শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়ে তাঁর আগ্রহের কথা এলাকাবাসী উল্লেখ করেন।
তাঁর ভাবনায় একটি রাস্তা একটি গ্রামকে বদলে দিতে পারে, একটি সেতু দুটি জনপদকে কাছে আনতে পারে; কিন্তু একটি শিক্ষিত প্রজন্ম বদলে দিতে পারে পুরো সমাজের ভবিষ্যৎ। এ কারণেই শিক্ষা তাঁর জনকল্যাণমূলক চিন্তার কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল বলে তাঁর পরিচিতজনেরা মনে করেন।
ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা:
বরুড়ার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও সংস্কারে এ কে এম আবু তাহেরের সহযোগিতার কথা স্মরণ করেন এলাকাবাসী। ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং অসচ্ছল মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি জনসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতেন বলে স্থানীয় সূত্র জানায়।
দুর্যোগ, অসুস্থতা, আর্থিক সংকট কিংবা পারিবারিক বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে আলাদা মর্যাদা দিয়েছিল। তাঁর বিনয়, উদারতা এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অভ্যাসের কথাও স্থানীয়দের স্মৃতিচারণে বারবার উঠে আসে।
স্বাস্থ্যসেবায় সোনাইমুড়ীর স্বপ্ন:
এ কে এম আবু তাহেরের জনকল্যাণমূলক ভাবনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল স্বাস্থ্যসেবা। নিজ গ্রাম সোনাইমুড়ী ও আশপাশের মানুষের চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করতে ২০ শয্যার একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ২০০২ সালে তাঁর উদ্যোগে হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে হাসপাতালটির নাম পরিবর্তন করে ‘এ কে এম আবু তাহের ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল’ করার সিদ্ধান্ত হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এলাকাবাসীর কাছে এই হাসপাতাল শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়; এটি তাঁর স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রিক স্বপ্নের প্রতীক।
তাঁর নামাঙ্কিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি বরুড়ার মানুষের জন্য তাঁর রেখে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক উত্তরাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পিতার উত্তরাধিকার বহন করছেন সুমন
এ কে এম আবু তাহেরের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের সদস্যরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র জাকারিয়া তাহের সুমন বর্তমানে কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসনের সংসদ সদস্য এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জাকারিয়া তাহের সুমন আদ্রা ইউনিয়নের সোনাইমুড়ী গ্রামের বাসিন্দা এবং তাঁর বাবা এ কে এম আবু তাহের একই এলাকার তিনবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। পিতার রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক ও জনকল্যাণমূলক উত্তরাধিকার ধারণ করে তিনি বরুড়ার মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন বলে স্থানীয় নেতাকর্মী ও বাসিন্দারা মনে করেন।
পরিবারের আরেক সদস্য আবু নাসের মোহাম্মদ ইয়াহিয়াও ব্যবসা ও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর মৃত্যু পরিবারটির জন্য গভীর বেদনার হলেও বরুড়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও তা শোকের আবহ তৈরি করেছিল।
ফাউন্ডেশনে মানবিক সেবা:
এ কে এম আবু তাহেরের নামে পরিচালিত বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, চক্ষু চিকিৎসা, বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প এবং সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনার কথা স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
এ ধরনের উদ্যোগ কেবল সহায়তামূলক কর্মসূচি নয়; বরং তাঁর মানবিক দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রয়াস। অসচ্ছল মানুষের চিকিৎসা, চোখের আলো ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাঁর জনসেবামুখী চিন্তাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
মৃত্যুর পরও জীবন্ত উত্তরাধিকার:
এ কে এম আবু তাহের ২০০৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি বরুড়া আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন বলে স্থানীয় ও রাজনৈতিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে জাতীয় পর্যায়ে শোক নেমে আসে এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিশিষ্টজনেরা শোক প্রকাশ করেন বলে তাঁর সমসাময়িকদের স্মৃতিচারণে জানা যায়।
মৃত্যুর দুই দশকেরও বেশি সময় পরও বরুড়ার মানুষের মুখে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে। এর কারণ শুধু তাঁর রাজনৈতিক পদমর্যাদা নয়; বরং এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষাবিস্তার, স্বাস্থ্যসেবা, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্মৃতি।
বরুড়ার ইতিহাসে এ কে এম আবু তাহের তাই কেবল একজন সাবেক সংসদ সদস্য নন। তিনি একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি, একটি জনপদের উন্নয়ন-স্বপ্নের নাম এবং মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণা।
মানুষের জীবন শেষ হয়, কিন্তু মানুষের কল্যাণে করা ভালো কাজের মৃত্যু নেই। এ কে এম আবু তাহেরের জীবন ও কর্ম সেই চিরন্তন সত্যেরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।