স্টাফ রিপোর্টার ::
বরিশালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো সংবাদ মাধ্যম ও পেশাজীবী সমাজকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতায় যুক্ত থাকা এই গুণী মানুষটির এমন করুণ পরিণতি শুধুই একটি মৃত্যু নয়; এটি সাংবাদিকতা পেশার চরম অনিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়ের এক বীভৎস দলিল।
দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরোর সাবেক প্রধান ও বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর পর বেরিয়ে আসছে তাঁর শেষ দিনগুলোর চরম দুর্দশা ও লড়াইয়ের কাহিনি। ২০২৩ সালে দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরো প্রধানের পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর এভাবে তাঁকে দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়ার নেপথ্যে ছিল গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালের বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের বলি হতে হয়েছিল পুলক চ্যাটার্জিকে। তৎকালীন মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ও তাঁর চাচা আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাতের মধ্যকার রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বরিশাল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। পুলক চ্যাটার্জি পেশাগত কারণে মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর সংবাদ কভার করা ও যোগাযোগ রক্ষা করার অপরাধেই অসন্তুষ্ট হয় বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ আবুল খায়ের খোকন সেরনিয়াবাত। ক্ষমতার দাপট ও রাজনৈতিক চাপের মুখে নতি স্বীকার করে দৈনিক সমকাল কর্তৃপক্ষ তাকে ব্যুরো প্রধানের পদ থেকে বাদ দেয়। স্থানীয় কিছু গণমাধ্যমকর্মীর দাবি, ওই সময় রাজনৈতিক বিরোধের প্রভাব কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় সাংবাদিকদের পেশায় পড়েছিল।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব হারানোর পর তিনি দীর্ঘ সময় কর্মহীনতা, শারীরিক অসুস্থতা ও আর্থিক চাপের মধ্যে ছিলেন দায়িত্ব হারানোর পর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ তিন বছর পুলক চ্যাটার্জি চরম কর্মহীনতা, অর্থাভাব এবং মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতায় দিন কাটিয়েছেন। দীর্ঘ ১৮ বছর সেবা দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি তাঁর প্রাপ্য আইনসংগত পাওনা পরিশোধ করেনি। দীর্ঘদিন বকেয়া আদায়ের চেষ্টা করেও তিনি সমকালের কাছ থেকে নিজের রক্ত পানি করা রোজগারের টাকা পাননি।
মৃত্যুর আগে পুলক চ্যাটার্জি পাঁচটি চিরকুট (সুইসাইড নোট) লিখে গেছেন, যা তাঁর তীব্র যন্ত্রণা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণার নীরব সাক্ষী। নিজের সহকর্মী সুমন চৌধুরীকে লেখা এক চিরকুটে তিনি আকুতি জানিয়ে গেছেন, যেন দৈনিক সমকালের কাছে জমে থাকা তাঁর বকেয়া পাওনা টাকা আদায় করে তাঁর অসহায় পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে লেখা এই চিরকুট প্রমাণ করে, কিভাবে একটি প্রভাবশালী গণমাধ্যম তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পাওনা আটকে রেখে তাঁকে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এমনকি চাকরি হারানোর পরও দীর্ঘদিনের প্রিয় কর্মস্থল সমকালের বরিশাল ব্যুরো অফিসে তিনি প্রায়ই যেতেন, অফিস চাবিও ছিল তাঁর কাছে। দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠানের প্রতি এমন আবেগ ও অসমাপ্ত পাওনার হিসাব নিয়ে ঘোরার পরেও প্রতিষ্ঠানটির নির্দয় আচরণে তিনি প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন।
এই চরম অন্যায়ের দায় এড়াতে পারে না স্থানীয় সাংবাদিক নেতৃত্বও। পুলক চ্যাটার্জি নিজে বরিশাল প্রেসক্লাবের মতো মর্যাদাপূর্ণ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। অথচ তাঁর এই টানা তিন বছরের আর্থিক ও পেশাগত সংকটের সময় সহকর্মী ও সাংবাদিক সংগঠনগুলো রহস্যজনক নীরবতা পালন করেছে। সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের স্লোগান দেওয়া সংগঠনগুলো এক অভিজ্ঞ সহকর্মীকে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নের মুখে একাকী ফেলে রেখে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
পুলক চ্যাটার্জির এই করুণ সমাপ্তি পরিষ্কার করে দেয় কিভাবে ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাবে একজন পেশাদার সাংবাদিকের জীবন তছনছ করে দেওয়া হয়, আর গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দীর্ঘদিনের কর্মী বকেয়া না দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়। ১৮ বছরের নিষ্ঠাবান সাংবাদিকতার পুরস্কার যদি হয় চরম অভাব, পাওনা বকেয়া থাকা আর অকাল মৃত্যু—তবে এই দায় দৈনিক সমকাল কর্তৃপক্ষ, তৎকালীন রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখানো পক্ষ এবং ব্যর্থ সাংবাদিক নেতৃত্বকে আজীবন বহন করতে হবে।