নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে আগামী ১০ বছরের জন্য বড় ধরনের কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত দুই ধাপে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে তৈরি এ পরিকল্পনায় দেশের তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মজুত ৯০ দিনের পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।একই সঙ্গে মহেশখালী-মাতারবাড়ীকে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, একাধিক এলপিজি টার্মিনাল ও বটলিং প্ল্যান্ট স্থাপন এবং সরবরাহব্যবস্থাকে অটোমেশনের আওতায় আনার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।বিপিসির এ কর্মপরিকল্পনায় অপরিশোধিত তেল আমদানি থেকে শুরু করে পরিশোধন, খালাস, সংরক্ষণ, পরিবহন, ডিপো পরিচালনা ও বিপণন—জ্বালানি ব্যবস্থাপনার প্রায় প্রতিটি স্তরে সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন কিংবা আমদানিতে সাময়িক সংকট তৈরি হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার সক্ষমতা বাড়ানোই এর অন্যতম লক্ষ্য।বিপিসি কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে দেশের প্রধান তেল শোধনাগার হিসেবে ইস্টার্ন রিফাইনারির ওপর পরিশোধন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ নির্ভরতা রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ১৫ লাখ ৩৫ হাজার টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করেছে। এ সক্ষমতা আরও বাড়াতে ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে।এর পাশাপাশি দেশে তৃতীয় পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি বা রিফাইনারি-৩ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা ধরা হয়েছে ৮০ লাখ টন, যা দৈনিক প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেলের সমতুল্য। পরিকল্পনায় মহেশখালীতে কম্পোজিট পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি অ্যান্ড পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স স্থাপনের উদ্যোগও রয়েছে।সংশ্লিষ্টদের আশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের আমদানিনির্ভরতার চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।দেশের জ্বালানি তেল আমদানি, খালাস, সংরক্ষণ ও পরিশোধন অবকাঠামোর বড় অংশ চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। নতুন পরিকল্পনায় এ অঞ্চলের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।মহেশখালী-মাতারবাড়ীতে জ্বালানি অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি এলপিজি আমদানি, সংরক্ষণ ও বটলিং প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। চট্টগ্রামের কাট্টলী, মোংলা ও এলেঙ্গাতেও এলপিজি ইমপোর্ট, স্টোরেজ ও বটলিং প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের অধীন বে-টার্মিনালের জায়গায় এলপিজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা জানান, একাধিক স্থানে এলপিজি আমদানি ও সংরক্ষণ সুবিধা তৈরি হলে কোনো একটি নির্দিষ্ট অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এলপিজি সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হবে।জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় অটোমেশনের মাধ্যমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার লক্ষ্যও রয়েছে বিপিসির। দেশের তেল বিপণন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ধাপে ধাপে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল কোম্পানির পতেঙ্গা ও চট্টগ্রামের প্রধান স্থাপনাগুলো অটোমেশনের আওতায় আনার প্রকল্প নেওয়া হবে। একই সঙ্গে দেশের সব ডিপোতে অটো গেজিং সিস্টেম স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।এর ফলে ডিপোতে কত পরিমাণ তেল প্রবেশ করেছে, কতটা মজুত রয়েছে এবং কতটা সরবরাহ করা হয়েছে—এসব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে ম্যানুয়াল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।জ্বালানি নিরাপত্তায় মজুত সক্ষমতা বাড়ানোকে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছে বিপিসি। আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট, যুদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞা, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে আমদানি ব্যাহত হলে পর্যাপ্ত মজুত না থাকায় দেশের পরিবহন, বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে দ্রুত প্রভাব পড়তে পারে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা ৯০ দিনের পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম, পার্বতীপুর, কুমিল্লা, মোংলা, গোদনাইল, ভৈরব ও সিলেটে নতুন স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সিলেট ও বগুড়ায় নতুন ডিপো স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী ধাপে ময়মনসিংহ ও ঈশ্বরদীতেও ডিপো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।নতুন এসব অবকাঠামো তৈরি হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে পরিবহনব্যবস্থার ওপর চাপ কমার পাশাপাশি কোনো একটি ডিপো বা সরবরাহ কেন্দ্রে সমস্যা দেখা দিলে অন্য কেন্দ্র থেকে জ্বালানি সরবরাহের সুযোগ বাড়বে।বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জ্বালানি সেক্টর নিয়ে আমার অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমরা বাস্তবসম্মত এবং গোছানো পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। প্রথমে ৫ বছরের টার্গেট নিয়ে শুরু করব। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলছি এবং মিটিং করছি। আশা করি এ সেক্টরে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।’