অনলাইন ডেস্ক:
রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে মানবপাচারের ঝুঁকিও বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের পাশাপাশি সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার ক্ষেত্রেও এ পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে বলে জাতিসংঘের এক বিশেষজ্ঞ যোগাযোগ নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবপাচারবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক সিওভান মুলালি, অভিবাসীদের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক গেহাদ মাদি এবং নারী ও মেয়েদের প্রতি বৈষম্যবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের চেয়ারম্যান-র্যাপোর্টিয়ার ক্লডিয়া ফ্লোরেস বাংলাদেশ সরকারের কাছে নথিটি পাঠিয়েছেন। গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নথিতে মানবপাচার প্রতিরোধ, ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ ও সুরক্ষা নিয়ে বিভিন্ন উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে।
তবে নথিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের কাছে পাওয়া তথ্য ও অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে তারা আগাম কোনো সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন না।
জাতিসংঘের নথিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ৪০৭টি মানবপাচারের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্ত ভুক্তভোগীদের মধ্যে ২৪৮ জন পুরুষ, ৮৮ জন নারী, ৪১ জন ছেলে এবং ২৯ জন মেয়ে। একজনের লিঙ্গপরিচয় ভিন্নভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, শনাক্ত ভুক্তভোগীদের মধ্যে ২১ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
নথিতে বলা হয়েছে, পুরুষ ও ছেলেদের কৃষি, পশুপালন, মাছ ধরা, বনকাজ ও নির্মাণশ্রমে পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। নারীদের ক্ষেত্রে কারখানার কাজ, গৃহস্থালি শ্রম এবং জোরপূর্বক যৌনকাজে পাচারের তথ্য রয়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে শিক্ষা ও জীবিকার সীমিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা শিশু ও তরুণদের চাকরি, শিক্ষা কিংবা বিয়ের প্রলোভন দেখাচ্ছে—এমন অভিযোগ রয়েছে।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, শিবিরে চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ, নথিপত্রের সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের পথের অভাব অনেক রোহিঙ্গাকে অনিরাপদ পথে যাওয়ার ঝুঁকিতে ফেলছে। এতে দালাল ও পাচারকারীদের ওপর নির্ভরতার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের কাছে তথ্য এসেছে।
রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে জোরপূর্বক বিয়ে, জোরপূর্বক শ্রম, যৌন শোষণ, মুক্তিপণের জন্য অপহরণ এবং জোর করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার মতো ঝুঁকির কথাও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের নথিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর হয়ে বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় বের হন। তাদের মধ্যে ৮৯০ জনের বেশি মারা যান বা নিখোঁজ হন।
২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এসব সমুদ্রযাত্রায় মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এসব যাত্রায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের আনুমানিক ৬৬ শতাংশ নারী ও শিশু।
এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৪৯ জন সমুদ্রপথে যাত্রা করেছেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা ৫৬ শতাংশ বেশি বলে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের ওই যোগাযোগ নথিতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে একটি নৌযান ডুবে প্রায় ২৫০ জন নিহত বা নিখোঁজ হন। এর আগে ৪ এপ্রিল কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়ে নৌযানটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রবল বাতাস, উত্তাল সমুদ্র ও অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে ৯ এপ্রিল নৌযানটি ডুবে যায়। নৌযানটি ডোবার আগে বা ডোবার সময় কোনো বিপদসংকেত পাঠানোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
১১ এপ্রিল ইন্দোনেশিয়াগামী একটি বাংলাদেশি পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ সমুদ্র থেকে বিপদগ্রস্ত কয়েকজনকে উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া নয়জনের মধ্যে আটজন পুরুষ ও একজন নারী ছিলেন। পরে তাদের বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ছিলেন। পাচারের ঝুঁকি যাচাইয়ের পর তাদের সংশ্লিষ্ট সেবার জন্য রেফার করা হয়। বাকি ছয় বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মানবপাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার ও আটকের তথ্যও নথিতে রয়েছে।
জাতিসংঘের নথিতে বলা হয়েছে, সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফেরত আনার পর কখনো কখনো আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়। পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে দেরি হলে তাদের ভুক্তভোগী হিসেবে সহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে অনিয়মিত অভিবাসী বা অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ কারণে সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের কীভাবে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয় এবং মানবপাচারের সম্ভাব্য ভুক্তভোগী হিসেবে তাদের কীভাবে যাচাই করা হয়, তা জানতে চেয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে মোট ১০টি বিষয়ে তথ্য ও ব্যাখ্যা চেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ৯ এপ্রিলের নৌকাডুবির পরিস্থিতি ও তদন্ত, সমুদ্র থেকে উদ্ধার ব্যক্তিদের নিরাপদ স্থানে নেওয়া, পাচারের ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং রোহিঙ্গা শিবিরে নারী ও শিশুদের সুরক্ষা।
এ ছাড়া মানবপাচারের ঘটনায় তদন্ত ও বিচার, ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা এবং ক্ষতিপূরণের সুযোগ নিয়েও জানতে চাওয়া হয়েছে।
দারিদ্র্য, শিক্ষার সীমিত সুযোগ, জীবিকার অভাব, পরিচয়পত্রের সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের পথের সংকটের মতো মানবপাচারের ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় বাংলাদেশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তাও জানতে চেয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতিসংঘ ও অংশীদারদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করছে। ২০২৬ সালের যৌথ আবেদনে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জরুরি সহায়তায় ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে, যা ২০২৫ সালের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম।
আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের ৩৩টি ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। সীমিত জীবিকা, চলাচলের বিধিনিষেধ এবং নিরাপদ ও নিয়মিত আইনি পথের অভাব মানবপাচার, শোষণ, শিশুশ্রম ও অনিয়মিতভাবে অন্যত্র যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে সংস্থাটির তথ্য থেকে উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের প্রকাশিত নথিতে রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি মানবপাচার প্রতিরোধ, ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ, নিরাপদ চলাচল এবং সমুদ্রপথে জীবন রক্ষার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।