নিজস্ব প্রতিবেদক:
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) মোঃ মাকসুদুর রহমানকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সম্পদের অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যেই তাঁকে অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখার গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তথ্যসূত্রে জানা যায়, মোঃ মাকসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে এনপিবি নিউজে ‘৬৫ হাজার বেতনের কর্মকর্তার অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
ওই প্রতিবেদনে মাকসুদুর রহমান ও তাঁর পরিবারের নামে বিপুল সম্পদের তথ্য ও অভিযোগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে তাঁর স্ত্রী নাসরিন আক্তারের নামে ৩০ ভরির বেশি স্বর্ণালংকার, একাধিক ব্যাংক হিসাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লেনদেন এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জমি ও ফ্ল্যাট থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়। গুলশান, লালবাগ ও ক্যান্টনমেন্টসহ বিভিন্ন এলাকায় জমির মালিকানার কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
এনপিবি নিউজের ওই প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, মোহাম্মদপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকে কেন্দ্র করে একটি সক্রিয় দালালচক্র সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। প্রতিবেদনে এ চক্রের সঙ্গে মাকসুদুর রহমানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়।
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক ও মুখপাত্র আক্তার হোসেনকে উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতেও দুদক অনুসন্ধান করতে পারে বলে তিনি জানান।
এ ছাড়া ১৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দৈনিক মানবকণ্ঠে ‘পাসপোর্ট কর্মকর্তা মাকসুদুরের চাকরি যেন সোনার হরিণ’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনেও মাকসুদুর রহমানের সম্পদ, পারিবারিক সম্পত্তি এবং মোহাম্মদপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকেন্দ্রিক বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
তবে ৬ ডিসেম্বর ২০২৫-এর প্রতিবেদন প্রকাশের পর মাকসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত হয়েছে কি না, কিংবা তদন্তের ভিত্তিতে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—এ বিষয়ে জনসমক্ষে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখার উপপরিচালক পদে পদায়ন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ফলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো তদন্ত বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা যেমন স্পষ্ট নয়; তেমনি অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি না হয়ে থাকলে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁকে পদায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী কী বিষয় বিবেচনা করেছে—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আলোচনা
মাকসুদুর রহমানের পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, তাঁর পিতা মোঃ সিদ্দিকুর রহমান বরিশালের হিজলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা। তাঁর এক ভাই সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের ব্যক্তিগত সহকারী সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
মাকসুদুর রহমান নিজেও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দাবি করেছেন। তবে এসব দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য প্রয়োজন।
এ ছাড়া তাঁর পিতার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ও সনদ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে কয়েকজন দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, ওই সনদ ভুয়া ছিল এবং এর মাধ্যমে চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
পারিবারিক ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার এসব দাবি সামনে আসার পর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে মাকসুদুর রহমানের পদায়ন নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন তাঁকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের রাজনৈতিক প্রভাবের সুবিধাভোগী হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। তাঁদের দাবি, ওই সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি পছন্দনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে বদলি-পদায়নের সুবিধা নিয়েছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও তিনি কীভাবে অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেলেন—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নজরুল ইসলাম ভূঞার নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ
অধিদপ্তরের সিস্টেম এনালিস্ট মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ভূঞাকে নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা।
তাঁদের অভিযোগ, ভুয়া শিক্ষা সনদ ব্যবহার এবং তৎকালীন পিএসসির ড্রাইভার আবেদ আলীর মাধ্যমে তিনি চাকরিতে প্রবেশ করেছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ওই সনদের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে এবং আবেদ আলীর মাধ্যমে সনদটি ব্যবহার করে তাঁর নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
তাঁদের আরও অভিযোগ, চাকরিতে প্রবেশের পর দীর্ঘদিন ধরে প্রধান কার্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অবস্থানের সুযোগে তিনি অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।
ক্রয় ব্যবস্থাপনায় কোটি কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগের ওই বলয়ে ক্রয় ব্যবস্থাপনা শাখার দায়িত্বে থাকা উপপরিচালক মোঃ আল আমিন মৃধার নামও এসেছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তাঁদের অভিযোগ, তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং অধিদপ্তরের বিভিন্ন ক্রয় ও সরবরাহ কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনকালে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, নিয়মিত দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে পছন্দের ও ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রমে অনিয়ম করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, দরপত্রের শর্ত নির্ধারণ, দরপত্র মূল্যায়ন, ঠিকাদার নির্বাচন, কার্যাদেশ প্রদান এবং বিল পরিশোধের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় ও আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আরও অভিযোগ, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ক্রয় ব্যবস্থাপনা শাখাকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্রয় ব্যবস্থাপনা শাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার কারণে মোঃ আল আমিন মৃধা এ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন বলেও দাবি তাঁদের।
তাঁদের অভিযোগ, অধিদপ্তরের বিভিন্ন ক্রয়কাজে একই ধরনের ঠিকাদার বা পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে বারবার কাজ দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা সীমিত করা হয়েছে।
প্রভাবশালী বলয় গঠনের অভিযোগ
নিজেদের প্রভাব ও অবস্থান সুসংহত করতে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।
অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, এ বলয়ে রয়েছেন সিস্টেম এনালিস্ট মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ভূঞা এবং ক্রয় ব্যবস্থাপনা শাখার দায়িত্বে থাকা উপপরিচালক মোঃ আল আমিন মৃধা। তাঁদের আরও দাবি, উপপরিচালক (প্রশাসন) মোঃ মাকসুদুর রহমানও ওই বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বলয়ের সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে চলেন।
অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, উপপরিচালক মোঃ আজিজুল ইসলাম, মোঃ বিপুল কুমার গোস্বামী ও মোঃ তারিক সালমানও কোনো কোনো সময়ে এ বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বা রয়েছেন। তাঁদের অন্যত্র বদলি বা পদায়ন করা হলেও সিস্টেম এনালিস্ট মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ভূঞা ও উপপরিচালক মোঃ আল আমিন মৃধা দীর্ঘদিন ধরে প্রধান কার্যালয়ে বহাল রয়েছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন প্রধান কার্যালয়ে অবস্থানের সুযোগে ওই দুই কর্মকর্তা তাঁদের প্রভাববলয় ধরে রেখেছেন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ শাখায় অবস্থান এবং তাঁদের সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের যোগাযোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
তদন্ত ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন
সংশ্লিষ্টদের মতে, মাকসুদুর রহমানসহ অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিয়োগ, বদলি-পদায়ন, ক্রয় এবং সম্পদসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকলে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন মূল প্রশ্ন—গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আদৌ কোনো অনুসন্ধান বা তদন্ত করেছে কি না; করে থাকলে তার ফল কী; এবং কোনো অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কী ধরনের প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, অভিযোগগুলো কেবল গণমাধ্যমে প্রকাশিত দাবি হিসেবে রয়েছে, নাকি এর পেছনে সরকারি তদন্ত বা নথিভিত্তিক কোনো তথ্যও রয়েছে।