ইরানের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব ফিরিয়ে নতুন ঝুঁকিতে ট্রাম্প?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইরানের যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনের এই অবস্থানের পেছনে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়িয়ে ভবিষ্যৎ চুক্তিতে সুবিধাজনক শর্ত আদায়ের কৌশল থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রসহ আঞ্চলিক দেশ ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

শনিবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। তাঁর দাবি, কঠিন পরিস্থিতিতে থাকায় তেহরান চুক্তিতে আগ্রহী। তবে ইরানের দেওয়া বর্তমান শর্ত তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানান তিনি।

পরদিন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ট্রাম্পের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া তেহরানের নজরে এসেছে। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠানো প্রস্তাবের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক জবাব এখনো পাওয়া যায়নি।

ইরানের প্রস্তাবে সাত দিনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের আটকে থাকা সম্পদ ছাড়তে হবে। পাশাপাশি লেবানন ও ইয়েমেনসহ পুরো অঞ্চলে বিস্তৃত যুদ্ধবিরতির কথাও রয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, এসব শর্ত বাস্তবায়নের পর হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়ে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বসবে তেহরান। গত জুনে দুই দেশের মধ্যে হওয়া একটি সমঝোতা স্মারকের সঙ্গে প্রস্তাবটির কিছু মিল থাকলেও শর্ত নিয়ে মতবিরোধের কারণে সেটি কার্যকর হয়নি।

চাপ বাড়িয়ে ছাড় আদায়ের হিসাব

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন মনে করতে পারে, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ অব্যাহত রাখলে দেশটি আলোচনায় আরও ছাড় দিতে পারে। এরই মধ্যে ইরানের ওপর নৌ অবরোধ জোরদার, তেল আয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং দেশটির সঙ্গে ব্যবসা করা অন্য দেশগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি ইরানের বিমান চলাচলের ওপরও যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট তেহরানের বৈশ্বিক আর্থিক স্বার্থকে লক্ষ্য করে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক চাপ তৈরির উদ্যোগের কথা জানিয়েছিলেন।

ন্যাটো ডিফেন্স কলেজের জ্যেষ্ঠ অনাবাসিক সহযোগী ফেলো রিচার্ড ওয়েইটজের মতে, ওয়াশিংটন হয়তো মনে করছে, আরও কিছু সময় গেলে অর্থনৈতিক চাপ ইরানকে চুক্তিতে বাড়তি ছাড় দিতে বাধ্য করবে।

তবে এই কৌশলের ঝুঁকিও রয়েছে। সংঘাত দীর্ঘ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর ঝুঁকি দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর চাপ বাড়তে পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ

ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে দেরি করা ট্রাম্পের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে আগস্টের শেষ দিকে রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে ৬৩ শতাংশ মার্কিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করেন; সমর্থন জানান ৩১ শতাংশ।

জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে উদ্বেগও বাড়তে পারে। ফলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহামাদ এলমাসরি মনে করেন, ইরানের প্রস্তাব ট্রাম্পের সামনে রাজনৈতিক সুযোগও তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, চুক্তি হলে নির্বাচনের আগে তেল ও গ্যাসের দাম কমানোর পথ তৈরি হতে পারে।

চাপের বিপরীত ফলের আশঙ্কা

বিশ্লেষক ক্রিগের মতে, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেও এর ফলে তেহরান অবশ্যই আরও ছাড় দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাঁর আশঙ্কা, ট্রাম্প প্রশাসন অর্থনৈতিক চাপকে ইরানের আত্মসমর্পণের ইচ্ছা হিসেবে ধরে নিতে পারে।

সংঘাত দীর্ঘ হলে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি আঞ্চলিক অবকাঠামো ও বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটতে পারে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের তৎপরতার কারণে লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

ক্রিগের মতে, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের ওপরও পড়তে পারে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্লেষক হ্যারিসনের মতে, ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান তেহরানকে বিস্মিত করেনি। তাঁর ধারণা, প্রস্তাব দেওয়ার একটি উদ্দেশ্য ছিল ইরান এখনো আলোচনায় আগ্রহী—এমন বার্তা নিজেদের জনগণ ও মার্কিন জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষই এমন একটি চুক্তি চায়, যেটিকে নিজেদের জন্য সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা যায়। তবে কে আগে ছাড় দেবে, তা নিয়ে মতপার্থক্য থাকায় সমঝোতার পথ এখনো অনিশ্চিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *