নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর মিরপুরে পরিচালিত ‘প্রতিবেশী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও কুটির শিল্প উন্নয়ন সংস্থা’কে ঘিরে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, অ্যাসেসমেন্ট এবং অর্থ লেনদেন নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রোকসানা দিপুর বিরুদ্ধেও প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের হিসাব না দেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থী।
অভিযোগের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) একটি নোটিশের কারণে। ২০২৫ সালের ২১ মে এনএসডিএর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ওই নোটিশের শিরোনামে ‘প্রতিবেশী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও কুটির শিল্প উন্নয়ন সংস্থা, ঢাকা’ কর্তৃক অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রমে সংঘটিত অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এনএসডিএর সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি এনএসডিএ-নিবন্ধিত। তবে অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রমে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল—নোটিশের ওয়েবপেজে সংযুক্ত নথির পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে সহজে দেখা যাচ্ছে না। ফলে ওই অনিয়মের বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্ট নথি ও পরবর্তী সিদ্ধান্ত যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রশিক্ষণার্থীদের অর্থ নিয়ে অভিযোগ
অভিযোগকারী কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থীর দাবি, দক্ষতা উন্নয়ন ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য তাঁদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থ নেওয়ার পর সেই টাকার পূর্ণাঙ্গ হিসাব বা ব্যয়ের স্বচ্ছতা তাঁরা পাননি বলে অভিযোগ তাঁদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থী বলেন, তাঁদের নামে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হলেও সেই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা তাঁদের জানানো হয়নি। কেউ কেউ প্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ারও অভিযোগ করেছেন।
সরকারি নথিতে অ্যাসেসমেন্ট অনিয়মের উল্লেখ
এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এনএসডিএর ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠানটির অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রমে অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের নোটিশ প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন কার্যক্রম নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশ্ন উঠেছিল।
দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠান, ঠিকানা নিয়েও ভিন্নতা
পুরোনো সরকারি নথিতেও ‘প্রতিবেশী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও কুটির শিল্প উন্নয়ন সংস্থা’র নাম পাওয়া যায়। ২০১৭ সালের বাংলাদেশ গেজেটের একটি নথিতে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা হিসেবে মিরপুর-৬, সেকশন-৬, ব্লক-৫, বাসা-২, রোড-৩৮ উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পুরোনো একটি প্রকাশিত তথ্যসূত্রে ‘প্রতিবেশী ট্রেনিং সেন্টার’-এর মিরপুরের সেকশন-৬ এলাকায় কার্যক্রম এবং বুটিক, ইলেকট্রিক এমব্রয়ডারি ও সাধারণ এমব্রয়ডারি প্রশিক্ষণের তথ্য পাওয়া যায়।
এসব নথি থেকে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের কার্যক্রমের অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া গেলেও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তথ্যের ঠিকানা ও বিবরণে পার্থক্য রয়েছে। ফলে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি কোথায়, কোন অনুমোদন বা নিবন্ধনের আওতায় এবং কী ধরনের প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছে—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যাচাই করা জরুরি।
রোকসানা দিপুর ভূমিকা
অভিযোগকারী প্রশিক্ষণার্থীদের বক্তব্যে রোকসানা দিপুর নাম এসেছে। তাঁদের দাবি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে তিনি অর্থ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রেখেছেন।
বিশেষ করে সরকারি বা কোনো প্রকল্পের অর্থ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়ে থাকলে সেই অর্থের বরাদ্দ, উত্তোলন, ব্যয় এবং উপকারভোগীদের তালিকা যাচাই করলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
সাততলা ভবন নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের কয়েকজনের দাবি, মিরপুরে সরকারি কোয়ার্টারের পেছনে বস্তি এলাকায় রোকসানা দিপুর একটি সাততলা বাড়ি রয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের সঙ্গে ওই সম্পদের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না।
ভবনটির সঙ্গে অভিযোগের কোনো আর্থিক যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা জানতে ভূমি রেকর্ড, রাজউকের অনুমোদন, কর নথি, ব্যাংক লেনদেন এবং সম্পত্তির মালিকানাসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
যুব পুরস্কার নিয়েও যাচাই দরকার
রোকসানা দিপুর যুব পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টিও অভিযোগকারীদের বক্তব্যে এসেছে। তবে কোন কর্তৃপক্ষ, কোন সালে এবং কোন ক্যাটাগরিতে তাঁকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল—এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।
তাই পুরস্কারের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। পুরস্কারটি সত্যিই দেওয়া হয়ে থাকলে তার কারণ, ক্যাটাগরি এবং প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও পরিষ্কার করা যেতে পারে।
যে নথিগুলো এখন গুরুত্বপূর্ণ
অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা বের করতে কয়েকটি নথি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে এনএসডিএর ২১ মে ২০২৫-এর নোটিশের পূর্ণাঙ্গ সংযুক্তি, ওই অনিয়মের তদন্ত বা সিদ্ধান্তের নথি, প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান নিবন্ধন, প্রশিক্ষণার্থীদের তালিকা, অ্যাসেসমেন্টের রেকর্ড, প্রশিক্ষণ ফি বা অর্থ গ্রহণের রসিদ এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব।
এর পাশাপাশি কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ। কতজন প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তাঁদের কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে এবং কতজনকে সনদ দেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য মিলিয়ে দেখলে অর্থ লেনদেনের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
তদন্তের দাবি
অভিযোগকারী ও কথিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রশিক্ষণার্থীরা বলছেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাঁদের দাবি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের নামে কোনো অর্থ অনিয়ম বা আত্মসাৎ হয়ে থাকলে তা চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করা হোক।
এদিকে রোকসানা দিপুর বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর অবস্থানও প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
সবশেষে, প্রকাশ্য নথিতে এখন পর্যন্ত যে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো—এনএসডিএ ২০২৫ সালের ২১ মে ‘প্রতিবেশী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও কুটির শিল্প উন্নয়ন সংস্থা’র অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রমে অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের নোটিশ প্রকাশ করেছিল।
অন্যদিকে কোটি টাকা আত্মসাৎ, প্রশিক্ষণার্থীদের অর্থ আত্মসাৎ কিংবা সেই অর্থ দিয়ে ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ার অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না দেখে এনএসডিএর নথি, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাব, প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, সম্পত্তির কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রকল্পের তথ্য একসঙ্গে যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।