দুরুপিনারে নূহের নৌকার খোঁজে রাডারে মিলল রহস্যময় কাঠামো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

তুরস্কের দুরুপিনার ফরমেশনে নূহের নৌকার সন্ধানে পরিচালিত নতুন রাডার জরিপে মাটির নিচে কিছু অস্বাভাবিক কাঠামোর সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছেন গবেষকরা। তাদের মতে, রাডারে পাওয়া কিছু সরলরেখা, কোণাকুণি সংযোগ, স্তরবিন্যাস ও সম্ভাব্য ফাঁকা অংশ মানবসৃষ্ট কোনো কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। তবে এ দাবি এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি এবং গবেষণাটি পিয়ার-রিভিউডও নয়।

দ্য জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নোয়াহ’স আর্ক স্ক্যানস’ (এনএএস) নামের একটি গবেষণা সংগঠন দুরুপিনার এলাকায় নতুন করে ভূগর্ভস্থ রাডার জরিপ চালিয়েছে। জরিপে পাওয়া বিভিন্ন অস্বাভাবিকতাকে গবেষকরা সম্ভাব্য করিডর, কক্ষ বা অভ্যন্তরীণ একাধিক স্তরের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

জরিপে প্রকৌশলী ড. খসরো বাখতারের তৈরি ‘বাখতাররাডার’ নামের ভূগর্ভস্থ ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। ড. বাখতার এক ভিডিও বার্তায় বলেন, কয়েক দশকের কর্মজীবনে তিনি এমন অস্বাভাবিকতা আগে দেখেননি। তবে এসব কাঠামো নৌযান, অন্য কোনো বস্তু নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু—এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি।

নূহের নৌকার সঙ্গে দুরুপিনারের সম্পর্ক

তুরস্কের দুরুপিনার ফরমেশন প্রথম নজরে আসে ১৯৫৯ সালে। কুর্দি এক রাখালের আবিষ্কারের পর তুরস্কের সেনা কর্মকর্তা ইলহান দুরুপিনারের নাম অনুসারে স্থানটির নামকরণ করা হয়। নৌকার মতো অস্বাভাবিক আকৃতি এবং আরারাত পর্বতের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে পরে এটি নূহের নৌকার সম্ভাব্য স্থান হিসেবে আলোচনায় আসে।

বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, মহাপ্লাবনের পর নূহের নৌকা আরারাত পর্বতমালার এলাকায় থেমেছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। সেই সূত্র ধরে কয়েক দশক ধরে দুরুপিনারকে সম্ভাব্য নৌকার স্থান হিসেবে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

তবে এখন পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক বা বৈজ্ঞানিকভাবে এমন কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা দুরুপিনারকে নূহের নৌকার ধ্বংসাবশেষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। ১৯৯০-এর দশকে প্রকাশিত এক গবেষণায় আমেরিকান উদ্ধার বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফাসোল্ড ও ভূতত্ত্ববিদ লরেন্স কলিন্স দুরুপিনারের গঠনকে প্রাকৃতিক শিলাগঠন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। কথিত লোহার অংশ নিয়েও তাদের গবেষণায় প্রাকৃতিক আগ্নেয় খনিজের উপস্থিতির কথা বলা হয়।

শুরু হয়েছে ড্রিলিং ও নমুনা সংগ্রহ

২০২৬ সালে তুরস্ক সরকার দুরুপিনার এলাকায় আরও বিস্তৃত ভূতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের অনুমতি দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর নোয়াহ’স আর্ক স্ক্যানস মাঠপর্যায়ে নতুন করে কাজ শুরু করে।

রাডার জরিপের পাশাপাশি গঠনটির ভেতরে ড্রিলিং করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। এর মাধ্যমে মাটির বিভিন্ন স্তর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে সেখানে কাঠ বা অন্য কোনো জৈব পদার্থের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

সংগঠনটির দাবি, সরু ছিদ্র দিয়ে একটি ছোট ‘গোফার’ রোবটও নিচে পাঠানো হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রোবটটি নিচে গিয়ে এমন কোনো শক্ত শিলা বা বেডরকে আটকে যায়নি, যা পুরো কাঠামোটিকে সাধারণ ভূতাত্ত্বিক গঠন হিসেবে ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে।

এ ছাড়া ফরমেশনের উন্মুক্ত পাশ ও কিনারা থেকেও মাটির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নমুনায় জীবাশ্মকৃত কাঠ কিংবা মানুষের তৈরি কোনো উপাদানের চিহ্ন রয়েছে কি না, তা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

প্রমাণ মিলবে, নাকি রহস্যই থেকে যাবে

দুরুপিনারকে ঘিরে নূহের নৌকার রহস্য কয়েক দশকের পুরোনো। বিভিন্ন সময়ে অনুসন্ধান, দাবি ও তত্ত্ব সামনে এলেও এখন পর্যন্ত কোনো দাবিই বৈজ্ঞানিকভাবে চূড়ান্ত প্রমাণে পরিণত হয়নি।

নতুন রাডার জরিপে পাওয়া অস্বাভাবিক কাঠামো তাই কৌতূহল বাড়ালেও এটিকে নূহের নৌকার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ এখনই নেই। কাঠামোগুলো আসলে কী, তা নির্ধারণে মাটির নমুনার পরীক্ষার ফল, আরও বিস্তৃত অনুসন্ধান এবং স্বাধীন গবেষকদের যাচাই প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *