পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে আইজিপি আলী হোসেন ফকির

মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:

শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, বিপিএম। সোমবার (১৯ অক্টোবর ২০২৬) তিনি নারায়ণগঞ্জ সদর থানাধীন শ্রী রামকৃষ্ণ মিশন পূজামণ্ডপ ও আমলাপাড়া সার্বজনীন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি পূজামণ্ডপগুলোর সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে আইজিপি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। সভায় মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং, সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা ও অনলাইন জুয়াসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে পুলিশের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।

পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিক ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে আইজিপি মোঃ আলী হোসেন ফকির বলেন, দুর্গাপূজার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, সহযোগিতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ফলে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপিত হচ্ছে।

মাদক, চাঁদাবাজ ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান

অপরাধ দমনে পুলিশের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে আইজিপি বলেন, ‘মাদক, চাঁদাবাজ ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। চাঁদাবাজ যে দলেরই হোক না কেন, তাকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

তিনি বলেন, সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও পুলিশের অন্যতম দায়িত্ব।

আইজিপি আরও বলেন, দুর্গাপূজার মতো ধর্মীয় উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে উদ্‌যাপনের জন্য পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। উৎসবের পরিবেশ বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। জনগণের সহযোগিতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।

কিশোর গ্যাং দমনে বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ লাইন্সের মাল্টিপারপাস কক্ষে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় আইজিপি দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদক, সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধে পুলিশের কার্যক্রম তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ মাদক, সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সারাদেশে বিপুলসংখ্যক মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে নতুন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, সম্প্রতি উপজেলা পর্যায়ে কিশোর গ্যাং দমনে বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব কমিটিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) সভাপতি এবং সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) সদস্যসচিব করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও জনগণের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সাইবার অপরাধ ও অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে পুলিশের উদ্যোগ

মতবিনিময় সভায় সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, অনলাইন জুয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি প্রতিরোধের বিষয়েও আলোচনা হয়।

আইজিপি জানান, সাইবার অপরাধ ও অনলাইনভিত্তিক অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের নবগঠিত সাইবার ইউনিট জোরালো ভূমিকা পালন করছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ শনাক্ত করা, অনলাইন প্রতারণা প্রতিরোধ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে এ ইউনিট কাজ করছে।

তিনি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে সভায় উঠে আসে।

মতবিনিময় সভায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত

পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে আইজিপির সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মোঃ মনিরুজ্জামান মিঞা, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান, নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোঃ হাবিবুর রহমান, পিপিএম, জেলা প্রশাসক মোঃ রায়হান কবির, জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সভাপতি শ্রী শংকর কুমার দে এবং পূজা উদ্‌যাপন কমিটির উপদেষ্টা শ্রী প্রবীর কুমার মিত্রসহ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

পরে জেলা পুলিশ লাইন্সের মাল্টিপারপাস কক্ষে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদের প্রশাসক, জেলা প্রশাসক এবং নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া সভায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও নৌপুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের পুলিশ সুপার, ৬২ বিজিবির অধিনায়ক, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালক, সিভিল সার্জন, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সহকারী পরিচালক, আনসার কমান্ড্যান্ট এবং জেলা পুলিশের অতিরিক্ত ও সহকারী পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) অংশ নেন।

সভায় বিভিন্ন বাহিনী ও সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে মতবিনিময় করেন।

নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ উৎসব উদ্‌যাপনে সমন্বিত উদ্যোগ

শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব পালন করছে।

আইজিপির পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও মতবিনিময় সভায় উৎসবের নিরাপত্তা, অপরাধ দমন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি মাদক, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের বিরুদ্ধে পুলিশের কঠোর অবস্থানের কথাও তুলে ধরা হয়।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, পূজা উদ্‌যাপন কমিটি এবং সাধারণ মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসব উদ্‌যাপন সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *