দক্ষ কর্মীদের বিনা খরচে ইতালি পাঠানোর উদ্যোগ মাহদী আমিনের

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ইতালীয় ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের বিনা খরচে ইতালি যাওয়ার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি জানান, খুব শিগগিরই স্বল্পপরিসরে এ কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর হোটেল রিজেন্সিতে ‘ইতালিতে দক্ষ অভিবাসনের জন্য ভাষা, নাগরিক ও পেশাগত প্রশিক্ষণ’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইতালীয় দূতাবাস ও তাদের আন্তর্জাতিক সহযোগী অংশীদারদের যৌথ উদ্যোগে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।

মাহদী আমিন বলেন, ইতালীয় ভাষা শিক্ষা, নির্দিষ্ট পেশাগত দক্ষতা অর্জন এবং কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আচরণ ও মূল্যবোধের বিকাশ—এই তিনটি বিষয় দক্ষ অভিবাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার এ ধরনের প্রশিক্ষণ কাঠামোকে জাতীয় পর্যায়ে আরও বিস্তৃত করতে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে চায়।

তিনি বলেন, দক্ষ, নিয়মতান্ত্রিক ও কম খরচে বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ায় বিদেশে কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে এবং সম্ভব হলে শূন্য খরচে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়।

প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা গেলে তা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এ জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাগুলোর অভিজ্ঞতা ও সফল উদ্যোগ কাজে লাগিয়ে দেশে দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে।

সেমিনারে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) প্রতিনিধিদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ইতালি সরকারের এ উদ্যোগকে জাতীয় নীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দিতে সরকার প্রস্তুত।

তিনি আরও বলেন, ইতালিতে দক্ষ কর্মী পাঠানোর এ উদ্যোগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশ ও খাতেও একই ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি নতুন নতুন আন্তর্জাতিক ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।

বর্তমানে ইতালিতে বসবাসরত আড়াই লাখেরও বেশি বাংলাদেশির অবদানের কথা উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, প্রবাসীরা তাঁদের শ্রম, মেধা ও দক্ষতার মাধ্যমে ইতালির সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। তাই প্রবাসীদের দক্ষতা, মর্যাদা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের তরুণদের মেধা ও যোগ্যতার ঘাটতি নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, মূল চ্যালেঞ্জ হলো তাঁদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।

মাহদী আমিন জানান, প্রবাসীদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের আদলে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বোয়েসেলসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দক্ষ অভিবাসন প্রক্রিয়া আরও সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তরুণদের তৃতীয় ভাষা শিক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী অন্যান্য ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। ইতালীয় ভাষা, আধুনিক কর্মদক্ষতা এবং পেশাগত নিয়মকানুন বিষয়ে চলমান প্রশিক্ষণ এ উদ্যোগেরই অংশ। ভবিষ্যতে ইতালীয় ভাষাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে মাহদী আমিন বলেন, এ প্রশিক্ষণ শুধু ব্যক্তিগত কর্মজীবন গঠনের জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ তৈরি করবে। প্রশিক্ষণ শেষে ধাপে ধাপে ইতালিতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন ঢাকায় নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মিশনপ্রধান ড. লরা টম বন্ডে, ইতালির উপমিশনপ্রধান ডা. ফেদেরিকো জামপারেল্লি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের উপপ্রধান বাইবা জারিনা এবং ইতালীয় দূতাবাসের অভিবাসন উপদেষ্টা জুসেপ্পে দি জিওভান্নি।

সেমিনারে জানানো হয়, ইতালির অভিবাসন আইন ২০২৩-এর ২৩ ধারার আওতায় দেশটির শ্রম ও সামাজিক নীতি মন্ত্রণালয় অনুমোদিত প্রস্থান-পূর্ব প্রশিক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্তে দক্ষ কর্মীদের জন্য বৈধভাবে ইতালিতে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। এসব প্রশিক্ষণে ইতালীয় ভাষা, দেশটির সমাজ ও নাগরিক জীবন সম্পর্কে ধারণা এবং সংশ্লিষ্ট খাতের পেশাগত দক্ষতা শেখানো হয়।

চলমান হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতের ‘টেস্ট’ প্রকল্পের আওতায় ‘ফ্রন্টিয়ার্স স্কিলস’ এবং ‘ফরম্যাজিঅনে’ টেক্সটাইল প্রকল্পের প্রশিক্ষণার্থীরাও সেমিনারে অংশ নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *