গাজীপুর এল.এ শাখায় হরিলুট: এলএ, প্রধানসহ দালাল চক্রের সিন্ডিকেটে নিঃস্ব ভূমি অধিগ্রহণের ভুক্তভোগীরা

স্টাফ রিপোর্টার:

কতিপয় সরকারি কর্মকর্তারা আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে ভিন্ন কৌশল অবলম্বনে বর্তমান সরকারের ইমেজ ক্ষুণ্নের আশঙ্কা

গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখাকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এলএ শাখার প্রধান সাবরিনা সুলতানা এবং তাঁর অধীনস্থ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী রফিক, জাহাঙ্গীর ও মুসলিম সহ একটি দালাল চক্রের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি লিটন ডালি, ফরিদা বেগম, সাইফুল মিয়া, আশরাফুল ইসলাম রয়েল, বাতেন, মমতাজ, সাবরিনা ও আরও একাধিক ব্যক্তি। তাঁদের দাবি, অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের হয়রানি ও আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের টাকা ছাড় করানোর ক্ষেত্রে নগদ ক্যাশ টাকা হলে আগ্রহীতার বিলের ৫% আর যদি বাকিতে হয় তাহলে অধিগ্রহণ বিল গ্রহিতার অ্যাকাউন্ট নম্বরের চেকের বিনিময়ে হলে ১০ থেকে ৩০% পর্যন্ত ঘুষ প্রদান করতে হয় অফিস কর্মকর্তাদের নির্ধারিত দালাল চক্রের সিন্ডিকেট সদস্যদের মাধ্যমে।

ভুক্তভোগী ও অনুসন্ধানী দলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের বিল পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন লিটন মিয়া। তাঁর অভিযোগ, ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়ার আশায় তিনি চড়া সুদে ২৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। দীর্ঘদিনেও টাকা না পাওয়ায় এবং বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষের চাপের মুখে পড়ে তিনি আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

লিটন মিয়ার দাবি, এ পরিস্থিতিতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁর চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে ৮০ শতাংশ মৃত্যুঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অবশিষ্ট মাত্র ৩০ হাজার টাকা ঘুষ না দেওয়ার কারণে তাঁর ফাইল আটকে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিক ও অনুসন্ধানী দলের সদস্যরা গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র নিয়ে এলএ শাখার প্রধান সাবরিনা সুলতানা ও তাঁর অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মুখোমুখি হন।

এ সময় অভিযুক্ত কর্মকর্তা রফিক ও জাহাঙ্গীরের বক্তব্য হিসেবে জানানো হয়, তাঁরা বলেন, ‘আমরা নিরুপায়, স্যার (সাবরিনা সুলতানা) সব জানেন এবং তিনিই সবকিছু করেন। আমরা কিছু জানি না।’

অন্যদিকে, এলএ শাখার প্রধান সাবরিনা সুলতানার সঙ্গে সাংবাদিক ও ভুক্তভোগীরা দেখা করতে গেলে তিনি প্রথমে ফাইল নিষ্পত্তির বিষয়ে কথা বলেন। পরে সাংবাদিকেরা ক্যামেরার সামনে জালিয়াতি ও কথিত গায়েবি আপত্তির বিষয়গুলো তুলে ধরলে তিনি জেলা প্রশাসকের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে চেম্বার থেকে বেরিয়ে যাওয়াতে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানী দলের দাবি, ক্ষতিপূরণের ফাইল আটকে রাখতে পেছনের তারিখ ব্যবহার করে কথিত আপত্তি বা মিস কেস তৈরি করা হচ্ছে। এসব আপত্তির পেছনে প্রকৃত আপত্তিকারী বা গ্রহণযোগ্য কারণ রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

তাঁদের অভিযোগ, এলএ শাখার কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালাল চক্রের যোগসাজশে এ ধরনের আপত্তি তৈরি করে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েও তাঁরা প্রতিকার পাননি বলে দাবি করেছেন এক ভুক্তভোগী। জেলা প্রশাসক বরাবরে অভিযোগ জানানোর পরও দালাল চক্রের তৎপরতা কমেনি বলে তাঁদের অভিযোগ।

ভুক্তভোগীদের দাবি, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। এলএ শাখার প্রধান সাবরিনা সুলতানা এবং অভিযোগে উল্লিখিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

তাঁদের মতে, সরকারি দপ্তরে এ ধরনের অনিয়ম ও হয়রানি চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশাসনের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হতে পারে এবং বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ক্ষতিপূরণের ফাইলের অগ্রগতি, ব্যাংক লেনদেন, কথিত ঘুষ দাবির তথ্য, মিস কেসের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।

ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে গাজীপুর জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন ভুক্তভোগীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *