অষ্টগ্রামে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পবিত্র আশুরা উদযাপন

এ আর সুমন:

কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলায় শুক্রবার ১০ মহররম, মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শোকাবহ দিন পবিত্র আশুরা মহান আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা পাওয়ার আশায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা নফল রোজা, নামাজ, দান-খয়রাত ও জিকির-আসকারের মধ্য দিয়ে পালন করেছেন।

আরবি ‘আশারা’ শব্দের অর্থ দশ। আর আশুরা মানে দশম। মহররম অর্থ সম্মানিত। হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররম সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা কারবালার প্রান্তরে ফোরাত নদীর তীরে নির্মমভাবে শহীদ হন।

শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসলামের মহান আদর্শকে সমুন্নত রাখতে কারবালায় হজরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর আত্মত্যাগ মানবতার ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। কারবালার শোকাবহ ঘটনা অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে অনুপ্রেরণা জোগায়। সত্য ও সুন্দরের পথে চলার প্রেরণাও জোগায়। কারবালার এই শোকাবহ ঘটনা ছাড়াও ইসলামের ইতিহাসে ১০ মহররম নানা গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে।

৩ নং অষ্টগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু বলেন, হযরত শাহজালাল ইয়ামেনী (রহ.)-এর অন্যতম প্রধান সহচর সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রহ.)-এর বংশধর এবং ‘ভাটির অলী’ হিসেবে খ্যাত নয় কোষা জমিদারি ত্যাগী হযরত সৈয়দ আবদুল করিম আল-হোসাইনী (রহ.) ওরফে সৈয়দ আলাই মিয়া সাহেব ছিলেন আহলে বায়াতের (নবী পরিবার) প্রেমে আত্মহারা এক মহান সাধক।

তিনি আল্লাহর ধ্যানে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, নিজের স্ত্রী-সন্তান এবং সুবিশাল ‘নয় কোষা’ জমিদারি ত্যাগ করে বাড়ির আঙিনায় একটি জীর্ণ কুটিরে সাধারণ জীবনযাপন শুরু করেন।

ঐতিহাসিক এই ত্যাগের ধারাবাহিকতায় তিনি ১৮৩৪ খ্রিষ্টাব্দে নিজ বাড়িতে একটি ইমামবাড়া হোসাইনী মোকাম (ইমামবাড়া) প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে সীমিত পরিসরে মহররমের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। আজ দীর্ঘ ১৯১ বছর ধরে বংশপরম্পরায় এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনে অষ্টগ্রামে এই মহররমের ঐতিহ্য ও প্রসারতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১০ মহররমে অনেক সনাতনী সম্প্রদায়ের মানুষকেও শোকানুষ্ঠানে অংশ নিতে দেখা যায়।

সৈয়দ আলাই মিয়া সাহেব মহররমের চাঁদ দেখার পর থেকেই বিশেষ কিছু নিয়ম অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন। চাঁদ দেখার পর হোসাইনী মোকাম বা ইমামবাড়ায় লাল ও কালো রঙের নিশান (পতাকা) উত্তোলন করতেন। সংযমী জীবন পরিচালনার্থে টানা ১০ দিন রোজা রাখতেন, খাট-পালং পরিহার করে মাটিতে শয়ন করতেন এবং অত্যন্ত সাধারণ পোশাক পরিধান করতেন।

নিরামিষ জাতীয় সাধারণ মানের খাবার গ্রহণ এবং খালি মাথায় ও খালি পায়ে চলাচল করতেন।

প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর থেকে মোকামের সামনে মিলাদ শরিফ পাঠ এবং সকাল ৮টা পর্যন্ত কারবালার ঐতিহাসিক আলোচনা ও জারি গান পরিবেশন করা হয়। এরপর সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত ভেতর বাড়িতে মহিলারা জারি পরিবেশন করেন।

পুরুষরা বাঁশ, বেত এবং রংবেরঙের কাগজ ও কাপড় দিয়ে কারবালার নিশানি ‘তাজিয়া’ তৈরির কাজ করেন। আসরের নামাজের পর মাতম ও মার্সিয়া (শোকগাথা) পরিবেশন করা হয়। মাগরিবের নামাজের পূর্বে ফাতেহা পাঠ ও দোয়া এবং ইফতারের জন্য ‘তাবারক’ বিতরণ করা হয়। এভাবেই প্রতিদিনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

প্রতি বছর ৫ মহররম ২২ মৌজার মাদারদের (মাতব্বর/প্রধান ব্যক্তিবর্গ/গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ) নিয়ে ‘পাঁচ গায়েলা’ নামক একটি বিশেষ পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ৯ মহররমের দিন সুশৃঙ্খলভাবে দিনে নিশান গাস্ত (গ্রাম চক্কর/গাঁওগাস্ত) এবং রাতে তাজিয়া গাস্ত বিষয়ে, পাশাপাশি ১০ মহররমসহ সার্বিক সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

১০ মহররম আশুরার দিন বিকেলে বিভিন্ন মোকাম থেকে তাজিয়া মিছিল নিয়ে মধ্য অষ্টগ্রামের কারবালা প্রাঙ্গণে তাজিয়া স্থাপনের মাধ্যমে ১০ দিনের এই আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি ঘটে।

হযরত সৈয়দ আবদুল করিম আল-হোসাইনী (রহ.)-এর শুরু করা এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের ধারা যুগ যুগ ধরে তাঁর বংশধরেরা বজায় রেখেছেন। তিনি ২২ মহররম ইন্তেকাল করার পর থেকে পর্যায়ক্রমে এই দায়িত্ব পালন করেছেন হযরত মাওলানা সৈয়দ আবদুল হেকীম আল-হোসাইনী (রহ.) এবং বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মাওলানা সৈয়দ কুতুব উদ্দিন আহমেদ আল-হোসাইনী চিশতী (রহ.)। বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে এই দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছেন জনাব সৈয়দ আহমেদুল কবির প্রিন্স।

এই বিশাল আয়োজন সফল করতে তাঁদের সার্বিকভাবে সহযোগিতা করে আসছেন হাবেলীর অন্যান্য সদস্য, স্থানীয় মহল্লাবাসী এবং ২২ মৌজার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। দীর্ঘ ১৯১ বছরের এই ঐতিহ্য আজ কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং অষ্টগ্রামের ভ্রাতৃত্ববোধ ও সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতীক।

ইসলামের ইতিহাসে আশুরা বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মারক হলেও কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর সঙ্গীদের আত্মত্যাগ এ দিনটিকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা ও গভীর মানবিক আবেদন। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামের সুমহান আদর্শ সমুন্নত রাখতে তাঁদের আত্মদান মানবজাতির ইতিহাসে চিরজাগরূক হয়ে থাকবে।

তিনি আরও বলেন, পবিত্র আশুরা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ইসলামের মূল শিক্ষা শান্তি, ন্যায়, সহমর্মিতা ও মানবকল্যাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামে বিভেদ, হানাহানি, বিদ্বেষ কিংবা সামাজিক বৈরিতার কোনো স্থান নেই। তাই আশুরার মহান শিক্ষা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আসুন আমরা সমাজে সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ আরও সুদৃঢ় করি। একটি ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী সমাজ গঠনে নিজেদের আরও নিবেদিত করি।

কারবালার ঘটনা মানবেতিহাসের এমন এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়, যা যুগে যুগে মানুষকে সত্যের পক্ষে এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে অনুপ্রাণিত করে আসছে। মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার যে শিক্ষা কারবালা আমাদের দিয়েছে, তা আজও সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণার উৎস।

কারবালার প্রান্তরে হজরত ইমাম হোসেন (রা.), তাঁর পরিবারের সদস্য ও বিশ্বস্ত সঙ্গীদের নিয়ে আজ থেকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ বছর আগে জুলুম, অন্যায় ও স্বৈরাচারের কাছে মাথা নত না করে শাহাদতের মহান মর্যাদা বরণ করেছিলেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ কারবালাকে সত্য ও ন্যায়ের জন্য সংগ্রামের এক অবিনাশী প্রতীকে পরিণত করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *