মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়ন ও স্বাভাবিক রাখতে সকল ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন। বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলার অবনতির অন্যতম মূল কারণ হচ্ছে কিশোর গ্যাং, মাদক, চুরি, রাহাজানি, ডাকাতি, ইভটিজিং ও ছিনতাই। সব অপরাধের মূল হচ্ছে কিশোর গ্যাং ও মাদক। তাই সবার আগে কিশোর অপরাধীদের অপরাধমুক্তসহ সকল অপরাধ বন্ধ করতে জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
আজকের শিশু-কিশোর আগামী দিনের কর্ণধার। শিশু-কিশোররা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে মাদকমুক্ত, মানবিক মন-মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠলেই দেশ ও জাতির উন্নতি ও অগ্রগতি নিশ্চিত হবে। প্রকৃতপক্ষে তাদের এ বয়সটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এবং বাহ্যিক জ্ঞানও কম থাকে। এ বয়সে তারা রঙিন স্বপ্ন দেখে এবং অতি কৌতূহলী হয়। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশের কারণে অনেক সময় তারা আশাভঙ্গের বেদনায় ব্যথিত হয়ে অপরাধ জগতের অন্ধকারে পতিত হয়। ফলে সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হয়। কিশোর অপরাধের ভয়াবহ পরিণতি উপলব্ধি করতে পারেন কেবল ভুক্তভোগী পিতা-মাতাই।
তাই সমাজের দায়িত্বশীল সকলের উচিত কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে সচেষ্ট হওয়া এবং কিশোর অপরাধীদের অন্ধকার জগৎ থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনা, পাশাপাশি তাদের সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করা। তবে হতাশার বিষয় হলো, এই কিশোর অপরাধীরা সমাজের বিভিন্ন কুচক্রী মহলের আশ্রয় পাচ্ছে।
কিশোর অপরাধ এবং নারায়ণগঞ্জের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির এসব কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, এই কিশোররাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। পরিবারের দরিদ্রতা ও অর্থের প্রাচুর্য—উভয়ই কিশোর অপরাধের জন্য দায়ী। দরিদ্রতার কারণে মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পারায় কিশোর-কিশোরীরা হতাশা ও মানবেতর জীবনযাপন করে। সেই হতাশা থেকে বাঁচতে তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে, যেসব কিশোর-কিশোরীরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থ পায় এবং যার জন্য অভিভাবকের কাছে তেমন জবাবদিহিতা করতে হয় না, তারা অর্থের প্রাচুর্যে মাদকাসক্তি ও ইভটিজিংসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে শিশু-কিশোরদের জন্য সুষ্ঠু বিনোদন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। কিশোররা অপরাধে জড়ানোর পেছনে একক কোনো কারণ নেই। খারাপ সঙ্গ, পরিবারের অসচেতনতা, সঠিক পরিচর্যার অভাব, নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি, মৌলিক চাহিদা পূরণ না হওয়া—এসবই এর পেছনে দায়ী।
তিনি আরও বলেন, কিশোর গ্যাং বলতে মূলত অপ্রাপ্তবয়স্কদের এমন সংগঠিত দলকে বোঝায়, যারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। কিশোর অপরাধের কারণগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক তত্ত্বাবধানের অভাব, মাদকাসক্তি, খারাপ সঙ্গ, শিক্ষার অভাব এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার উল্লেখযোগ্য।
মা-বাবার অবহেলা, সামাজিক অবক্ষয়, অল্প বয়সে স্মার্টফোনসহ প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং সঙ্গদোষও এ সমস্যার জন্য দায়ী। প্রতিদিনই গণমাধ্যমে কিশোর অপরাধের খবর পাওয়া যাচ্ছে। রাস্তাঘাটে ছিনতাই, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, বাধা দিলে সহিংসতায় জড়ানো—এসব ঘটনায় কিশোর অপরাধীরা জড়িয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা নেশাগ্রস্ত থাকে, ফলে তাদের বিবেক-বুদ্ধি কাজ করে না।
জেলা প্রশাসক বলেন, কিশোর অপরাধীদের অপরাধমুক্ত করতে জেলার সব প্রশাসনের সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা পদক্ষেপের পরও তাদের অপতৎপরতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কিশোর সন্ত্রাস একটি বড় সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, কিশোররা যেন অপরাধে জড়াতে না পারে এবং কেউ যেন তাদের অসৎ কাজে ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরিবারই একটি শিশুর প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
পরিবার যদি সন্তানদের সঠিকভাবে লালন-পালন করে এবং তাদের আচরণ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে, তাহলে তারা সুস্থ ও সুন্দর জীবন গড়ে তুলতে পারবে। শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা, পাঠাগারে গিয়ে বই পড়া এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার সুযোগ বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, কিশোর অপরাধের মূল কারণ মাদক। তাই নারায়ণগঞ্জকে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নিশ্চিত করতে পারলেই কিশোর গ্যাংমুক্ত নারায়ণগঞ্জ গড়া সম্ভব।
একটি পরিবারের প্রবীণদের উচিত অপ্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা, নৈতিকতা শেখানো এবং তাদের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখা। স্কুলের বাইরে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে। ছিন্নমূল শিশু-কিশোরদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে এবং যারা ইতোমধ্যে অপরাধে জড়িয়ে গেছে, তাদের সুপথে ফিরিয়ে আনতে হবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ করা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক দায়িত্ব। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগে কিশোরদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, মা-বাবা যদি সন্তানের চলাফেরা, সঙ্গ এবং কার্যকলাপ সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাহলে সন্তান অপরাধে জড়াবে না। একটি পরিবারের সন্তান ভালো হলে শুধু পরিবার নয়, সমাজেও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন তারা দেশের সম্পদে পরিণত হয়।
তাই কিশোর অপরাধমুক্ত সমাজ গড়তে পরিবার ও সমাজের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। কোথাও অপরাধের আশঙ্কা থাকলে তা দ্রুত প্রশাসনকে জানাতে হবে, যাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
শেষে তিনি বলেন, বর্তমান শিশু-কিশোরদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারলেই আগামীর নারায়ণগঞ্জ হবে একটি শান্তিপূর্ণ, সুখী ও সমৃদ্ধ নগরী। কিশোর অপরাধীদের সম্পর্কে তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার জন্য তিনি জেলাবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। নারায়ণগঞ্জ জেলার উন্নয়নে যে কোনো সময় সবার জন্য তার দরজা খোলা রয়েছে।