আলাউদ্দিন সুইটসের সাবেক কর্মচারী নিশাদ দস্তগীরকে ঘিরে শত কোটি টাকার সম্পদ ও অর্থপাচারের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

আশির দশকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় ছাত্র সমাজের একজন কর্মী হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে পথচলা শুরু করেছিলেন সৈয়দ গোলাম দস্তগীর নিশাদ, যিনি নিশাদ দস্তগীর নামেই বেশি পরিচিত। পরবর্তীতে চট্টগ্রামে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা করতে না পেরে জীবিকার সন্ধানে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে প্রথমে বাংলাদেশি মালিকানাধীন একটি রেস্টুরেন্টে ওয়েটার হিসেবে কাজ করেন। পরে আলাউদ্দিন সুইটস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে পরিচিতি লাভ করেন। এছাড়া ব্রিটিশ নাগরিক এক নারীকে বিয়ে করার মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশ পাসপোর্ট অর্জন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর নিশাদ দস্তগীর দেশে ফিরে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তিনি অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচারের একটি সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন। সমালোচকদের দাবি, ব্রিটিশ পাসপোর্ট ব্যবহার করে কমিশনের বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচারে তিনি ভূমিকা রাখতেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, দৃশ্যমান কোনো বড় ব্যবসা বা বৈধ আয়ের উৎস না থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান। গত দেড় দশকে সরকারি কোনো পদ বা দায়িত্বে না থেকেও বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা এবং আওয়ামী লীগের সাবেক কয়েকজন মন্ত্রীসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিদেশ সফরের সঙ্গী হিসেবেও একাধিকবার অংশ নেন নিশাদ দস্তগীর। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সফরের আড়ালে অর্থ পাচারের কার্যক্রম পরিচালিত হতো। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কাজ পাইয়ে দেওয়া, লাইসেন্স অনুমোদন এবং সরকারি ঠিকাদারি এনে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন নিশাদ দস্তগীর। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না করেও তিনি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

অনুসন্ধানী সূত্রের দাবি, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ দিয়ে ঢাকার উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের ১৪/এ সড়কের ১/এ নম্বর বাড়িতে প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ছয়তলা বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, ওই ভবনে বিভিন্ন সময় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আনাগোনা ছিল এবং সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হতো। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার আনুষ্ঠানিক তদন্তের তথ্য প্রকাশ হয়নি।

অভিযোগে আরও বলা হয়, নিজ বাড়িতে খুব কম অবস্থান করলেও নিশাদ দস্তগীর দীর্ঘ সময় রাজধানীর অভিজাত হোটেল—রেডিসন ব্লু, সোনারগাঁও ও ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থান করতেন। এসব হোটেলের ব্যয় তার সহযোগীরাই বহন করতেন বলে দাবি করা হয়েছে।

সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে প্রায় আট থেকে নয় মাস রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ৩২৬ নম্বর ভিআইপি কক্ষে অবস্থান করেন নিশাদ দস্তগীর। অভিযোগ রয়েছে, ওই কক্ষটি বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের গোপন বৈঠকের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে এ বিষয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিশাদ দস্তগীর ভারত হয়ে পুনরায় যুক্তরাজ্যে চলে যান।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের একাংশের দাবি, মাত্র এক যুগের ব্যবধানে একজন সাবেক রেস্টুরেন্ট কর্মীর বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাদের মতে, নিশাদ দস্তগীরের সম্পদের উৎস, দেশ-বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার আর্থিক লেনদেনের বিষয়গুলো নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেও বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে নতুন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *