আলমাস হোসেন:
গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও আদালতের নির্দেশ—কোনোটিই থামাতে পারেনি আশুলিয়া ভূমি অফিসের কথিত ঘুষ বাণিজ্য। অভিযোগ উঠেছে, অফিসের নাজির, উমেদার ও নৈশপ্রহরীর একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট টাকার বিনিময়ে খাস খতিয়ানভুক্ত, মামলা-মোকদ্দমায় জড়িত এমনকি জবরদখলকৃত জমিতেও নির্বিঘ্নে নামজারি করে দিচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চক্র এতটাই প্রভাবশালী যে একের পর এক সংবাদ প্রকাশের পরও তারা বহাল তবিয়তে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এতে ভূমি সংক্রান্ত সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষ কার্যত তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছেন।
অভিযোগে সামনে এসেছে ভূমি অফিসের নাজির সোহান হাওলাদার, কানুনগো জহিরুল ইসলাম, নৈশপ্রহরী মানিক মিয়া, উমেদার সাইদুল, ইয়াসিন, আলমগীর শিকদার ঝন্টু, ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক রফিকুল ইসলাম, আবুল কালাম আজাদ ও দালাল দ্বীন ইসলামের নাম।
ভুক্তভোগীরা জানান, টাকা দিলে কোনো ধরনের শুনানি ছাড়াই নামজারি সম্পন্ন হয়। আর টাকা না দিলে শুনানির দিন আবেদনকারী উপস্থিত থাকলেও কাগজে তাকে ‘অনুপস্থিত’ দেখিয়ে আবেদন বাতিল করা হয়। ফাইল গ্রহণ, শুনানির তারিখ নির্ধারণ থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপেই এই সিন্ডিকেটের প্রভাব কাজ করে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাইপাইল মৌজার ৭২৬২ নম্বর খতিয়ানের ১৫১৬৫ নম্বর দাগের পাঁচ শতক জমি নিয়ে জবরদখলের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে নামজারি করা হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর কয়েক দিনের মধ্যেই সেই নামজারি বাতিল করা হয়।
ভুক্তভোগী বাবুল জানান, জমিটির পর্চায় জবরদখল লেখা থাকায় নামজারি দিচ্ছিল না, ফলে উমেদার সাইদুলের মাধ্যমে দেড় লাখ টাকা দেওয়া হয়। টাকা দেওয়ার পর নামজারি সম্পন্ন হয় এবং তিনি নিয়মিত খাজনাও পরিশোধ করেন। কিন্তু হঠাৎ মোবাইলে বার্তা আসে—নামজারি বাতিল।
এ বিষয়ে উমেদার সাইদুল টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, তিনি একা নন। অফিসের একাধিক স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে এই টাকা ভাগ হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এর আগেও তার বিরুদ্ধে ভুয়া খারিজ করিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, নাজির সোহান হাওলাদার সরকারি দায়িত্বের তুলনায় ব্যক্তি মালিকানার জমি খারিজের কাজেই বেশি সময় ব্যয় করেন। একাধিক সূত্র জানায়, তিনি উর্ধ্বতন ম্যানেজ করে এই সিন্ডিকেট চালান।
নৈশপ্রহরী মানিক মিয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ নতুন নয়। সরেজমিনে দেখা গেছে, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনুপস্থিত থাকলেও তিনি অফিস কক্ষে বসে সরকারি কম্পিউটার ব্যবহার করে নামজারির কাজ করছেন, যা বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন।
লাভলী নামে এক নারী অভিযোগ করেন, নামজারি করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মানিক মিয়া তার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নেন। দীর্ঘদিনেও কাজ না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে মাত্র এক লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়। বাকি টাকা ‘বড় স্যারকে দেওয়া হয়েছে’ বলে জানানো হয়। প্রশ্ন উঠেছে, এই ‘বড় স্যার’ আসলে কে?
এ ছাড়া আশুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক রফিকুল ইসলাম ও ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, মিসকেস তামিল করানো, নামজারি শেষে জোত খোলা—প্রতিটি ধাপেই আলাদা করে টাকা দিতে হয়।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বড় রাঙ্গামাটিয়া এলাকায় প্রায় ৪৪ শতক সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় নামজারি করে দেওয়ার বিষয়ে। নামজারির আবেদন করেছিলেন আসলাম হোসেন নামের এক ব্যক্তি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন বলেন, প্রথমে খাস খতিয়ানের জমি হওয়ায় খারিজ বাতিল করা হয়। পরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে একই জমি পুনরায় খারিজ করে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, বড় আশুলিয়া মৌজায় ১৮৫ নং খতিয়ানে চাঁদ চন্দ্র সাহার ছয় শতাংশ ৬০ পয়েন্ট জমি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য সরকার অধিগ্রহণ করলেও সেই জমি মালিকের নাম পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তর দেখিয়ে ‘চাঁদ চন্দ্র বালা’ নামে খারিজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদিয়া আক্তার বলেন, এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, এর আগে একটি জাতীয় দৈনিকে আশুলিয়া ভূমি অফিসের ঘুষ বাণিজ্য ও দালাল চক্র নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হলে আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযোগগুলো তদন্তাধীন। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, এই তদন্ত কবে বাস্তব ফল দেবে। দ্রুত দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে ঘুষের এই ব্যবস্থাই নিয়মে পরিণত হবে, আর ভূমি সেবা কাগজে-কলমেই ডিজিটাল থেকে যাবে—বাস্তবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না।