উপর মহলকে ম্যানেজ করেই চলছে ভূমি কর্মকর্তা মিজানের ঘুষ বাণিজ্য

রূপগঞ্জ প্রতিনিধি:

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন মিজান, যিনি এলাকায় ‘নায়েব মিজান’ নামে পরিচিত, সরকারি বেতন মাত্র ৪০-৫০ হাজার টাকা হলেও ঘুষ ও অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, মিজানের উপর মহলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় তিনি নানাভাবে অবৈধ সম্পদ অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছেন।

হাতের দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি, অর্ধকোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল গাড়ি, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় চারটি আলীশান বাড়ি এবং পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের নামে আরও অঢেল সম্পদ—এসবই মিজানের জীবনের প্রতীক। অভিযোগকারীরা জানান, ভূমি অফিসে ঘুষ ও অনিয়মের মাধ্যমে ফাইল জিম্মি করে দেলোয়ার হোসেন মিজান প্রায় শতকোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললে জানা যায়, ভূমি অফিসের খারিজ, খাজনা, নামজারি, পর্চা এবং অন্যান্য জমি সংক্রান্ত কাজে মিজান মোটা অংকের অর্থ আদায় করেন। জাল দলিলে নামজারি, সাধারণ নামজারি, ‘ক’ ও ‘খ’ তফসিলভুক্ত জমির কাজও তিনি অনিয়মের মাধ্যমে সম্পন্ন করেন। একজন স্থানীয় জমির দালাল আব্দুল মজিদ বলেন, “দাউদপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে প্রস্তাব পাঠাতে নরমাল নামজারির জন্য মিজান স্যারের কাছে ৫ হাজার টাকা দিতে হয়। জমি কাজ একটু জটিল হলে ১০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়।”

ভুক্তভোগী হেলাল উদ্দিন জানান, “নামজারি জোত কেটে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে অন্য জনের নামে দেয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। আমি এ বিষয়ে ডিসি অফিস এবং উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি অফিসে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।” অন্য এক ভুক্তভোগী হালিমা আক্তার বলেন, “দাউদপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নায়েব ছাড়া কোনো কাজই হয় না। ঘুষ ছাড়া কেউ কাজ করতে পারবে না।”

জানা যায়, মিজান দীর্ঘ দুই যুগ ধরে ভূমি অফিসে চাকরি করছেন। শুরুতে সাধারণ পদে ছিলেন, পরে ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি পান। কয়েক বছরের ব্যবধানে খারিজ, খাজনা, নামজারি, পর্চা এবং জমি সংক্রান্ত অন্যান্য কাজে ঘুষ ও দালালির মাধ্যমে অগাধ সম্পদ অর্জন করেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, মিজান তার লেনদেনের জন্য অবৈধভাবে ওমেদার ইসমাইল ও কামালকে ব্যবহার করেন।

দেলোয়ার হোসেন মিজানের নামে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের দক্ষিণ সস্তাপুর এলাকায় রয়েছে একটি তিনতলা ভিলা, একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি, বাইতুল মনির রোডের মাথায় চার ইউনিটের একটি ছয়তলা বাড়িসহ প্রায় ৫ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার মূল্যমানের একাধিক বাড়ি। একই রোডের সামনেই ১০ কাঠা জমিতে একটি টিনসেড বিল্ডিং রয়েছে। লিংকরোডের ভেতরেই তার গাড়ি গ্যারেজ, যা মূল্যমান প্রায় ২ কোটি টাকা। তিনি নিজেই অর্ধকোটি টাকার গাড়ি ব্যবহার করেন। প্রতিবেশীদের বক্তব্য, বাড়িগুলো মিজানের হলেও নেমপ্লেট তার ভাই আনোয়ার হোসেনের নামে রাখা আছে।

এই বিষয়ে দেলোয়ার হোসেন মিজান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা। সম্পত্তি আমার নয়, আমার ভাইয়ের। আমি সরকারি নিয়ম মেনে কাজ করি।” অন্যদিকে, উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি ফরিদ আল সোহান বলেন, “যদি দাউদপুর ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যথাযথ অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির হিসাব তো তার কাছে নেই।”

স্থানীয়রা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, মিজানের এমন ঘুষ ও অনিয়ম চলতে থাকলে সাধারণ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়বে। দালালদের মাধ্যমে চলা জমির লেনদেন, ফাইল জিম্মি এবং অগাধ সম্পদ অর্জনের কারণে সাধারণ মানুষ আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

দেলোয়ার হোসেন মিজানের এই কার্যক্রম শুধু দাউদপুর ইউনিয়নেই নয়, নারায়ণগঞ্জের অন্যান্য এলাকা থেকেও ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। স্থানীয়দের মতে, সরকারি পদে থাকা এমন কর্মকর্তা যদি অনিয়মের পথ ধরে চলে, তবে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও জনবিশ্বাসের ক্ষতি হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *