এসআই গোলাম নাসিমের নেতৃত্বে সিএমপির অভিযান, পুলিশ কনস্টেবলসহ গ্রেপ্তার ৪

স্টাফ রিপোর্টার:

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) খুলশী থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে অপহরণ ও ডাকাতির মামলায় এক পুলিশ কনস্টেবলসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় ভুক্তভোগীর কাছ থেকে লুণ্ঠিত একটি মোটরসাইকেল এবং ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ থাকা আরও দুটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) নগরীর পাহাড়তলী থানাধীন ফইল্লাতলী বাজার ও বিটাক বাজার এবং সীতাকুণ্ড থানাধীন বায়েজিদ লিংক রোড এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন অনিক দাশ (২৭), যিনি বান্দরবান জেলা পুলিশ লাইন্সে কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত; ওয়াহিদ মোহাম্মদ জেবল হোসেন ওরফে অনিক ওয়াহিদ (৩৯), মহিউদ্দিন সেলিম (৫২) এবং মোহাম্মদ ওয়াহিদ নাসির ওরফে ডায়মন্ড (৩৮)। অপহরণ ও ডাকাতির ঘটনায় তাঁদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্ত করছে পুলিশ।

খুলশী থানা পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) মো. হাসান মোস্তফা স্বপন, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) সোহেল পারভেজ, সহকারী পুলিশ কমিশনার (বায়েজিদ বোস্তামী জোন) মোহাম্মদ আরিফ হোসেন এবং খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুজ্জামানের সার্বিক দিকনির্দেশনায় অভিযান পরিচালিত হয়। অপারেশন অফিসার এসআই গোলাম মোহাম্মদ নাসিম হোসেনের নেতৃত্বে এসআই মো. জালাল আহমেদ, এএসআই মো. জাকির হোসেন, এএসআই এরশাদ আলমসহ পুলিশের একটি দল অভিযানে অংশ নেয়।

ফয়েজ লেক হাসপাতালের সামনে মোটরসাইকেল আটকে অপহরণের অভিযোগ

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে মারুফুর রহমান অপু (২২) তাঁর তিন বন্ধু এমরান (২৪), নিশাত (২৬) ও আসিফকে (২৩) সঙ্গে নিয়ে তিনটি মোটরসাইকেলে কক্সবাজার ভ্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাঁরা নিজেদের মোটরসাইকেলে করে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিলেন।

এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, পরদিন ১৭ অক্টোবর রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে তাঁরা চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানাধীন জাকির হোসেন রোডের ফয়েজ লেক চক্ষু হাসপাতালের সামনে পৌঁছালে একটি মেরুন রঙের প্রাইভেট কার ও দুটি মোটরসাইকেল তাঁদের পথরোধ করে। এ সময় গাড়ি ও মোটরসাইকেলে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি তাঁদের ঘিরে ফেলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা মারুফুর রহমান অপুর মোটরসাইকেলের চাবি নিয়ে তাঁকে মারধর করেন। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাঁকে জোরপূর্বক একটি প্রাইভেট কারে তুলে নেওয়া হয়। এ সময় অপর একজন তাঁর মোটরসাইকেলটি নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে অপুকে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন স্থানে ঘোরানো হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। রাত আনুমানিক তিনটার দিকে তাঁকে বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন শেরশাহ এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে তাঁর ব্যবহৃত প্রায় ২০ হাজার টাকা মূল্যের একটি ভিভো মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরে তাঁকে চলন্ত গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হুমকি দিয়ে চলে যান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার পর ভুক্তভোগী ও তাঁর স্বজনেরা মোটরসাইকেলটি উদ্ধারের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোটরসাইকেল বিক্রির বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে তদন্তে নতুন সূত্র পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ফেসবুকে মোটরসাইকেল বিক্রির বিজ্ঞাপন ধরে পুলিশের অভিযান

মামলার এজাহার অনুযায়ী, ভুক্তভোগী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘অনিক’ নামের একটি আইডি থেকে মোটরসাইকেল বিক্রির একটি স্টোরি দেখতে পান। পরে ওই আইডির সঙ্গে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করলে মোটরসাইকেলটির দাম ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা জানানো হয়। মোটরসাইকেলটি কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে তিনি পাঁচ হাজার টাকা অগ্রিমও দেন বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

পরে তাঁকে বায়েজিদ লিংক রোডের মুখে পুলিশ বক্সের সামনে যেতে বলা হয়। নির্ধারিত স্থানে যাওয়ার পর খুলশী থানা পুলিশের সহায়তায় অনিক দাশকে আটক করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অনিক দাশকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে পাহাড়তলী থানাধীন বিটাক বাজার এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে ওয়াহিদ মোহাম্মদ জেবল হোসেন ওরফে অনিক ওয়াহিদ এবং মহিউদ্দিন সেলিমকে আটক করা হয়। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোহাম্মদ ওয়াহিদ নাসির ওরফে ডায়মন্ডকে আটক করা হয় বলে পুলিশ জানায়।

পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, ২০ অক্টোবর ভোর সাড়ে চারটার দিকে পাহাড়তলী থানাধীন ফইল্লাতলী বাজারের সিদ্দিক কমিশনারের বাড়ির রোডে কুদ্দুছের গ্যারেজে অভিযান চালিয়ে ভুক্তভোগীর লুণ্ঠিত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ থাকা আরও দুটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশ কনস্টেবল গ্রেপ্তার, তদন্তে গুরুত্ব

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে অনিক দাশের বান্দরবান জেলা পুলিশ লাইন্সে কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত থাকার তথ্য সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মামলার তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে প্রত্যেকের ভূমিকা, মোটরসাইকেল লুণ্ঠন এবং অপহরণের অভিযোগের প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় ২০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে খুলশী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার জিআর নম্বর ২৪৪। এজাহারে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৬৫, ৩৯৫, ৩৯৭ ও ৪১২ ধারার উল্লেখ রয়েছে। এসব ধারায় অপহরণ, ডাকাতি এবং ডাকাতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ গ্রহণ বা সংশ্লিষ্ট অপরাধের অভিযোগের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা তিনটি মোটরসাইকেলের মধ্যে একটি ভুক্তভোগীর কাছ থেকে লুণ্ঠিত এবং বাকি দুটি ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উদ্ধার করা মোটরসাইকেলগুলোর মালিকানা, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং অন্য কোনো অপরাধে সেগুলো ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।

চট্টগ্রাম নগরে অপহরণ ও ডাকাতির মতো অপরাধ প্রতিরোধে অপরাধীদের শনাক্ত করা, লুণ্ঠিত সম্পদ উদ্ধার এবং অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার চারজনের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা আইন অনুযায়ী নির্দোষ বলে গণ্য হওয়ার অধিকার রাখেন। মামলার তদন্ত শেষে ঘটনার সঙ্গে তাঁদের প্রত্যেকের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *