মোঃ হাসান আলী:
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ওয়ারী। রাজধানী ঢাকার পূর্বাচল ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রবেশদ্বার হওয়ায় এই বিভাগের কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। পাশাপাশি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় ওয়ারী বিভাগে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সব সময়ই বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনের পর এবং ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে এ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে অবনতির দিকে যায়।
ওই সময় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এবং হত্যাকাণ্ড আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পায়। পুলিশের মনোবলও ছিল ভেঙে পড়ার মতো অবস্থায়। ঠিক এমন সংকটময় মুহূর্তে ওয়ারী বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ডিসি মো. হারুনুর রশিদ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করা বিসিএস ২৮তম ব্যাচের এই মেধাবী ও চৌকস পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে শুরু করেন।
ওয়ারী জোনের প্রতিটি থানায় জনবসতি বেশি হওয়ায় অপরাধীদের অবাধ চলাচল ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। দায়িত্ব গ্রহণের পর ডিসি হারুনুর রশিদ প্রতিটি থানা এলাকায় সাব-ইন্সপেক্টরদের সমন্বয়ে আলাদা আলাদা পেট্রোল টিম গঠন করেন। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী এলাকা ছিনতাইয়ের জন্য কুখ্যাত হয়ে উঠেছিল। ওই এলাকায় ছিনতাই যেন মহামারী আকার ধারণ করেছিল। ডিসি হারুন ছিনতাইয়ের নির্দিষ্ট স্পট ও জড়িত সিন্ডিকেট শনাক্ত করে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করেন। এতে বেশিরভাগ ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার হয়ে আইনের আওতায় আসে, যা যাত্রাবাড়ীবাসীর জন্য বড় স্বস্তি নিয়ে আসে।
জুলাই আন্দোলনের পর ওয়ারী বিভাগের পুলিশের মনোবল ছিল অত্যন্ত দুর্বল। এ অবস্থায় ডিসি হারুন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সমন্বয় সভা করেন। পুলিশ ও জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি বাহিনীর মনোবল পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
গণঅভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সংক্রান্ত সর্বাধিক মামলা হয় ওয়ারী বিভাগে, যার বড় অংশ যাত্রাবাড়ী থানায়। অভিযোগ রয়েছে, চাইলে এসব মামলা ব্যবহার করে কেউ কেউ আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারতেন। তবে ডিসি হারুনুর রশিদ অত্যন্ত সততা ও মানবিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। কোনো নিরীহ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে তিনি ছিলেন কঠোর ও সচেতন।
ছিনতাই, ডাকাতি ও মাদকবিরোধী অভিযানে তিনি শুধু নির্দেশনা দিয়েই থেমে থাকেননি; অনেক সময় নিজেই টিম নিয়ে মাঠে নেমেছেন। পেট্রোল টিম ঠিকমতো কাজ করছে কিনা, তা নিজে তদারকি করেছেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনগুলোর নাশকতা প্রতিরোধে থানাগুলোকে সব সময় প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন।
তার অধীনে কোনো পুলিশ সদস্য অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ালে তিনি তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। ওয়ারী বিভাগের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মামলার সূক্ষ্ম তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক ও প্রশাসনিক সহায়তা ডিসি হারুন নিজেই নিশ্চিত করতেন। নতুন ও সৎ পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক।
ডিসি হারুনুর রশিদের বদলিতে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষ মর্মাহত। যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দাদের আশঙ্কা, নির্বাচনের আগে এমন একজন জনবান্ধব ও কর্মঠ কর্মকর্তার বদলি নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তারা আশা প্রকাশ করেছেন, নতুন ডিসিও যদি হারুন সাহেবের মতো সৎ ও মানবিক হন, তবে এ অঞ্চলের মানুষ নিরাপদে থাকতে পারবে।
ওয়ারী বিভাগের মানুষের জন্য নীরবে কাজ করে যাওয়া এই সৎ ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সম্মান জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।